স্মরণ

আহমদ ছফা :যেন এক জলপ্রপাত

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৮
১৯৪৩ সালে গাছবাড়ীয়া-চন্দনাইশ, চট্টগ্রামে আহমদ ছফার জন্ম। চাষা পরিবারের ছফা লেখাপড়া করেন চট্টগ্রাম আর ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে বের হন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ করে। কিছুদিন সমাজবিজ্ঞান নিয়ে প্রথাগত গবেষণা করলেও দ্রুত প্রস্থান করে দেশ-সমাজ ভাবনা নিয়ে মৌলিক চর্চা শুরু করেন। অল্পদিন সাংবাদিকতা, পত্রিকা বের করা, মুদ্রণ ব্যবসা, এনজিওর সাথে জড়ালেও লেখালেখিই ছিল তার ভজন-সাধন। সময়ান্তরে ছফার জীবন লম্বা ছিল না, তবে চওড়া ছিল বটে। তার জন্মের সন দুর্ভিক্ষের সন হিসেবেই সবাই জানে। ছফার চেহারাতেও সেই দুর্ভিক্ষ স্পষ্ট, কিন্তু মনটা যেন জ্যান্ত জলপ্রপাত। জীবনের শেষদিন পর্যন্তও যা ছিল প্রস্রবণশীল। ছফার প্রথম উপন্যাস সূর্য তুমি সাথী, উপন্যাসকুলের সেরা উপন্যাস-লেখকের আপন দাবি। ছাত্রাবস্থায় লিখেছিল সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, উপন্যাস—সবমিলিয়ে গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশের অধিক। পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরাণ জাপানি ভাষায়, বস্তি উজাড় কবিতা জার্মানি ভাষায়, ওঙ্কার ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে, হয়েছে চলচ্চিত্রায়ণ। ওঙ্কারের চিত্রনাট্য তৈরিতে না কি সত্যজিত্-এর আগ্রহ ছিল। গ্যেটের ফাউস্ট কাব্যনাট্যের অনুবাদ তার অমর সৃষ্টি। বেশ কিছু গানও আছে তার ঝোলায়। লেখক পয়দার কারখানা বানিয়েও তিনি সফল হয়েছিলেন। আহমদ ছফা ছিলেন একমপ্লিশ্ড ঔপন্যাসিক। কিন্তু ইতিহাসও তো কম লিখেননি তিনি। ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লিখেছেন ওঙ্কার, সলিমুল্লাহ খানের মতে এই লেখার ভেতর দিয়েই ছফার জন্ম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস অলাতচক্র। আর সিপাহী বিপ্লব নিয়ে লেখা সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস কোন উচ্চতার কেতাব তা তো তরফদার সাহেবের ভূমিকা পড়লেই ঠাহর করা যায়। আলি কেনান বাংলাদেশের মুক্তির মহানায়ক শেখ মুজিবের মেটাফোর। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছফা লিখতে চেয়েছিলেন-‘দি ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেড’। বলতেন কেউ আমাদের বড্ড ঠকাইছে। যুদ্ধের ফসল আমাদের ঘরে উঠে নাই। দেশ স্বাধীন হলেও সমাজ বদলায় নাই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে ভারতের শাসক শ্রেণীর হাতে গিয়ে পড়ল তাই ছিল আহমদ ছফার মূল আপত্তি। খুব অল্প বয়সেই কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কৃষক সমিতির সাথে যুক্ত হন। গবেষকদের মোটা মোটা অভিসন্দর্ভে মুক্তিযুদ্ধের যে উপন্যাসগুলো জায়গা পায় সেখানে অলাতচক্রের নাম উঠেছে বলে চোখে পড়েনি। দুঃখ কি! সময় কি শেষ! স্বাধীনতার পর স্পষ্টভাষী আহমদ ছফা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে লিখেছিলেন বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস। সাহিত্যিক-লেখকদের কপালে যেসব পুরস্কার জোটে, ছফার জীবনে সেসব জোটেনি। জোটেনি মুক্তিযোদ্ধার খেতাবও। তবে এতে তার দুঃখ-বিস্ময় কিছুই ছিল না। প্রশংসা-পুরস্কার এসবের জন্য ছফা কখনো লেখেনি। বরং পুরস্কার সৃষ্টিশীল মানুষের নাকি সামনে চলার পথ আটকে দেয়। আহমদ ছফা ছিলেন বাংলার বিবেক, বাঙালির কণ্ঠস্বর। তাকে নিয়ে জাতির অবাক বিস্ময়ে হা করে থাকার দিন কোনদিন শেষ হবে না। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই আহমদ ছফা না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। আজ শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করছি। লেখক :শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় zahidhistory¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন