আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র্যের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে। অথচ আমাদের দেশের অর্থ দিয়েই দারিদ্র্য দূর করার জন্য চেষ্টা করা যায়। যাকাত ও ফিতরার টাকা দিয়েই সেটা সম্ভব। সদকা অর্থ দান। মূলত যাকাত বা সদকা শব্দের অর্থ পবিত্র করা বা প্রবৃদ্ধি দান করা। শরিয়তের পরিভাষায় সুনির্ধারিত সম্পদ সুনির্ধারিত শর্তে তার হকদারকে অর্পণ করা। অর্থাত্ আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশ্বর্যবানরা যে ধনসম্পদ অর্জন করেছে তার মধ্যে গরীব-দুঃখী অসহায়দের প্রাপ্য অবশ্যই আছে। দান করা দয়ার ব্যাপার নয় বরং তা কর্তব্যের কাজ। সদকা দু’ধরনের হতে পারে, অবশ্য পালনীয় সদকা যেমন- যাকাত ও ফিতরা। অপরদিকে ঐচ্ছিকভাবে দান-দক্ষিণা ইত্যাদি যা মানব কল্যাণে ব্যয় করতে হয়, পবিত্র কোরানে উভয় প্রকার দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—“যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় দান করেন, যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ্ কল্যাণকারীদের ভালবাসেন” (৩ সূরা আল-ইমরান: ১৩৪)।
“দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে এক উত্তম ঋণদান করেন, তাদের দেওয়া হবে বহুগুণ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার” (৫৭ সূরা হাদীদ :১৮)।
আমাদের দেশে সঠিকভাবে সবাই সদকা দিলে দারিদ্র্যের হার কমে যেত। আবার কেউ কেউ এমনভাবে মানুষকে সদকা দেয় তাতে সদকাটা উপকারে আসে না, কেউ কেউ সদকাস্বরূপ কমদামের লুঙ্গি বা শাড়ি দিয়ে থাকে যা কি না মানুষ একবার পরিধান করার পর দ্বিতীয়বার আর পরতে পারে না। হয় ছিঁড়ে যায় না হয় রং উঠে যায় কাপড়ের। আসলে আমাদের সদকা এমনভাবে দেয়া উচিত যাতে যে কোন দরিদ্র মানুষ অর্থনৈতিক কষ্ট থেকে মুক্তি পায়। তাতে একা দিয়ে হোক বা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হোক। অর্থাত্ এ বছর যাকে সদকা দিব পরের বছর যাতে তাকে আর সদকা দিতে না হয়, সদকার টাকা দিয়ে একটা দরিদ্র মানুষকে তার ন্যূনতম একটা রিজিকের ব্যবস্থা করে দেয়া যায়। যেমন কথায় আছে—যদি কাউকে একবেলা মাছ খাওয়াতে চাও, তাহলে তাকে একটা মাছ কিনে রান্না করে খাওয়াও আর যদি তাকে সারাজীবন মাছ খাওয়াতে চাও তাহলে একটা ছিপ কিনে তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দাও। নিয়মিত দান বিপদ-আপদ দূর করে, সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। দান যেন লোক দেখানো না হয় অর্থাত্ ডান হাত দিয়ে দান করলে বাম হাত যেন বুঝতে না পারে। ইসলাম নীরব দানের কথাই বলে। কিন্তু আমাদের দেশের যাদের যাকাত দেয়ার সামর্থ্য আছে তারা কি যথাযথভাবে যাকাত আদায় করছি? যাকাতটা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না মানুষের কল্যাণে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করছি ? এভাবে আমরা কতটুকু চিন্তা করছি। একজনের যাকাতের টাকা দিয়ে একজন গৃহহীন মানুষকে গৃহদান বা সারাবছরের জন্য কারো রিজিকের ব্যবস্থা করা যায় না। এক্ষেত্রে সংঘবদ্ধভাবে দান বেশি কার্যকরি। প্রতিটি এলাকায় যারা এলিট তারা সংঘবদ্ধভাবে দানের মাধ্যমে সমাজের তথা দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে এগিয়ে আসতে পারেন। এই দান করার অভ্যাস ছোটবেলা থেকে না করলে বড় হয়ে, সামর্থ্যবান হলেও এই চর্চার প্রতিফলন ঘটে না। তাই প্রতিটা মা-বাবার উচিত সন্তানদের সঠিকভাবে দান করার শিক্ষা দেয়া ।
আমরা যতই সম্পদশালী হই না কেন, নিজের যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু রেখে তা দান করা নিয়ম। মানুষের প্রতিটি কর্মের যেমন হিসাব আল্লাহ্ নিবেন তেমনি সম্পদেরও। আর নিয়মিত দানে সবাই অভ্যস্ত হলে আমাদের দেশে একদিন অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক :প্রাবন্ধিক
