এবারের ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৪, ২২:০০
দেশে এবারের ঈদ-উল-ফিতর সার্বিক বিবেচনায় সন্তোষজনকভাবে উদযাপিত হইয়াছে। গত কয়েক বত্সরের অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়া সরকার পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করায় এরূপ সাফল্য অর্জিত হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। প্রথমেই আসা যাক, ঈদে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ফেরা প্রসঙ্গে। গতবার যেইখানে বাড়ি ফিরিতে কোন কোন ক্ষেত্রে তিন দিন লাগিয়াছে এবং পথিমধ্যে পড়িতে হইয়াছে ঈদের নামাজ, সেইখানে এইবার নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরা সম্ভব হইয়াছে। শেষ মুহূর্তে আন্তঃনগর ট্রেনগুলিতে আগের মত উপচাইয়া পড়া ভিড় তেমন পরিলক্ষিত হয় নাই। বাস-লঞ্চেও যাতায়াত ছিল অনেকটা স্বস্তিদায়ক। গত বত্সর ঈদ-উল-ফিতরের ছুটির পর প্রকাশিত ইত্তেফাকের ১২ আগস্ট সংখ্যায় দেখা যায়, ছুটির মধ্যে গাইবান্ধায় কোচের সহিত লোকাল বাসের সংঘর্ষে দশজন নিহত হয়। ইহাছাড়া কুমিল্লা, বগুড়া, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১৬ জন। এই বত্সর ঈদের ছুটিতে গতকাল বিকাল পর্যন্ত পাওয়া খবরে কয়েক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন সার্জেন্টসহ ৫ব্যক্তির নিহতের খবর পাওয়া গিয়াছে। পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখির পর সড়ক সংস্কার ও অন্যান্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এইবার প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে কম হইয়াছে বলিয়া অনুমান করিতে কষ্ট হয় না। এইবার ঈদের ছুটিতে সরকারি হাসপাতালগুলির তত্পরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণত প্রতি বত্সর এই সময় বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে রোগীদের নানামাত্রিক দুর্ভোগ পোহাইতে দেখা যায়। ঈদের ছুটির কারণে ডাক্তার-নার্সের সংকটই ইহার মূল কারণ। হাসপাতালের অধিকাংশ জনবল একসঙ্গে শহর ছাড়ায় এই সংকট তৈরি হয়। তবে এইবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে আগেভাগেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে রোগীদের তেমন কোন সমস্যার মুখোমুখি হইতে হয় নাই। বিশেষত ঈদের ছুটির মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ডাক্তার-নার্সগণের আন্তরিক ব্যবহার এইবার অনেককেই মুগ্ধ ও বিমোহিত করিয়াছে। সরকারি হাসপাতালগুলিতে এই প্রথম ঈদের বন্ধের মধ্যে প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া গিয়াছে। তাহাছাড়া এবার দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল। কয়েক স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে খুন-খারাবির ঘটনা ঘটিলেও তাহার মাত্রা অন্যবারের তুলনায় ব্যাপক নহে। কমলাপুর, কাউনিয়া ও কিশোরগঞ্জসহ এইবার কয়েকস্থানে বিভিন্ন বিরোধে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গিয়াছে। তবে রাজধানী ঢাকায় বাসাবাড়িগুলি ছিল নিরাপদ। এখন পর্যন্ত কোন বড় ধরনের চুরি বা ডাকাতির খবর আমাদের কাছে আসে নাই। এতকিছুর পরও এইবার ঈদের ছুটিতে দুইটি বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। পদ্মা ও যমুনায় নৌকাডুবিতে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী যথাক্রমে ১১ ও ৭ জনের সলিল সমাধি ঘটিয়াছে। বিষয়টি দুঃখজনক। এইজন্য আমরা মর্মাহত ও শোকার্ত। যতদূর জানা যায়, পদ্মায় প্রচণ্ড বাতাসের কবলে পড়িয়া এবং যমুনায় একটি সেতুর সহিত ধাক্কা লাগিয়া এই দুইস্থানে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। অন্যান্য বত্সর আমরা এইসময়ে দেখিতে পাই ভয়াবহ লঞ্চডুবির ঘটনা। প্রধানত ফিটনেসবিহীন লঞ্চ ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাইয়ের কারণে এই লঞ্চদুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। এইবার বাড়তি সতর্কতার কারণে এখন পর্যন্ত এই ধরনের নেতিবাচক খবর আমরা পাই নাই। তবে নৌকাডুবির ক্ষেত্রে যাহা ঘটিয়াছে তাহাতে প্রশাসনের কীবা করিবার ছিল! মূলত মানুষের সতর্কতার অভাবেই এই দুইটি দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। যাহা হউক, সুব্যবস্থাপনার কারণে এইবার ঈদের ছুটি আগের বত্সরগুলির তুলনায় সকলের ভাল কাটিয়াছে নিঃসন্দেহে। এইবার ঈদের কেনাকাটা যেমন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ছিল, তেমনি শুধু ঈদের কারণে দ্রব্যমূল্য তেমন একটা বাড়ে নাই। সামগ্রিক পরিস্থিতি দৃষ্টে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, সরকার ও প্রশাসন চাহিলে এবং সময় থাকিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করিলে তথা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে জনদুর্ভোগ বহুলাংশে কমাইয়া আনা সম্ভব। এবার সরকার ও যাহাদের প্রযত্নশীলতায় মানুষ স্বস্তিতে ঈদ উত্সব উদযাপন করিতে পারিলেন, তাহারা অবশ্যই সাধুবাদ পাইবার দাবি রাখেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন