ফিলিস্তিনীদের বেদনা-দীর্ণ জীবন

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৪, ২২:০১
ঈদের দিনে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাজী হইয়াও শেষ পর্যন্ত ইসরাইল কথা রাখে নাই। গত সোমবার ঈদের দিনেও গাজার শরণার্থী শিবিরে হামলা চালান হইয়াছে। স্বজন-সন্তানহারা মানুষের আহাজারি, রক্ত আর কাফনের কাপড় ফিলিস্তিনবাসীর ঈদের উত্সবকে যথার্থই আন নাকবায় পরিণত করিয়াছে। “আন-নাকবা”—অর্থাত্ মহাদুর্যোগ, মহাদুর্বিপাক। জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিনটির বিরোধিতা করিয়া প্রতি বত্সর ১৫ মে তারিখে নাকবা দিবস পালন করে ফিলিস্তিনীরা। ১৯৪৮ সালের এই দিনে পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলির সহায়তায় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই হইতে চলিতেছে নিপীড়িত-নির্যাতিত ফিলিস্তিন জাতির নাকবা। প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্ম-মৃত্যু ঘটিতেছে কিন্তু নাকবার অবসান হইতেছে না ফিলিস্তিনীদের। এইবার গোটা রমজান মাসই ফিলিস্তিনীদের জন্য ছিল দুর্যোগপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ঈদের দিনেও তাহারা নিস্তার পাইলেন না ইসরাইলী বর্বরতার হাত হইতে। এইবারের ঈদ ফিলিস্তিনীদের জীবনে কণামাত্র আনন্দও বহন করিয়া আনে নাই। কেমন করিয়া আনিবে? যেই দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসরাইলী বিমান হামলায় কিছু না বুঝিয়াই প্রাণ হারাইয়াছে তাহার মাতা ঈদের দিন কেমন করিয়া আনন্দ করিবে? সন্তানকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া নিরাপদে সরিবার কালে যেই পিতার মৃত্যু হইয়াছে তাহার সন্তানেরা এই ঈদে কেমন করিয়া আনন্দে মাতিবে? কামানের গোলা, মৃত্যুবাহী বিমানের ভীতিকর আওয়াজের মধ্যে থাকিয়া কেমন করিয়া ঈদ হইতে পারে। ঈদের দিনেও সেইখানে মৃত্যু হানা দিয়াছে। গোটা বিশ্ব মিলিয়া কী ফিলিস্তিনীদিগকে দিতে পারিতেছে জীবন ও সম্পদের ন্যূনতম নিরাপত্তা? ইসরাইলের অজুহাত, তাহারা তাহাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই গাজা ভূখন্ডে আঘাত হানিয়া যাইতেছে। তাই বলিয়া নির্বিচারে বোমা বর্ষণ ও রকেট হামলা চালাইয়া গণহত্যা চলিতে থাকিবে? আশ্রয় শিবির, এমনকি শিশুদের স্কুল পর্যন্ত রেহাই পাইবে না? ঈদের দিন এবং তাহার পরের দিনও মানবতা বিরোধী ইসরাইলী হামলার তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানাইয়াছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে পোপ ফ্রান্সিস আকুল আহ্বান জানাইয়াছেন যুদ্ধ বিরতির। কিন্তু নেতানিয়াহু অনমনীয়। অস্ত্র-বিরতি লইয়া ব্যাপক মাতামাতি চলিতেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হইতেছে না। ফিলিস্তিনীদিগকে একেবারে মাটিতে মিশাইয়া ফেলিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যেন ইসরাইল। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় তথা প্রধান শক্তিমানেরা সব কিছুই দেখিতেছে; কিন্তু কতটুকু ক্রিয়া করিতেছে? আরেকটি বিষয়, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে কি কোন যুদ্ধ চলিতেছে? অথচ বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের প্রধান-প্রধান স্থলগুলি হইতে এমনভাবে কথাবার্তা বলা হইতেছে যেন ফিলিস্তিন ও ইসরাইল পরস্পরের বিরুদ্ধে কাছাকাছি মাত্রার শক্তিমত্তা লইয়া সংঘাতে নামিয়াছে। কিন্তু ইহা বাস্তবতা নহে। এখন যাহা চলিতেছে তাহা হইতেছে নির্জলা আগ্রাসন, সন্ত্রাসবাদী দমনের ধুয়া তুলিয়া বেসামরিক ফিলিস্তিনীদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। বেসামরিক জনগণকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো সকল ক্ষেত্রেই নিন্দনীয়। ফিলিস্তিন নেতৃত্বের একাংশের নামে যে পাল্টা জবাব দেওয়া হইতেছে তাহা ইসরাইলী হামলার সহিত এতটুকু তুলনীয় হইতে পারে? এমতাবস্থায় সমগ্র বিশ্ব জুড়িয়া শান্তিকামী মানুষের প্রশ্ন :ফিলিস্তিনে বোমা পড়ে জাতিসংঘ কী করে? তাহাদের আরো প্রশ্ন :ফিলিস্তিনে বোমা পড়ে আরব লীগ কী করে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, সংলাপ নহে সামরিক উপায়ে সমস্যার সমাধান ঘটাইয়া ফেলিবার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া উঠিয়াছে ইসরাইল। অতঃপর প্রশ্ন; মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রধান কণ্টকস্বরূপ বিরাজমান সমস্যাটির সমাধান তাহা হইলে কোন পথে? বিশ্ব-শান্তির জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন অপরিহার্য; এই বিষয়ে শান্তিকামীদিগের মধ্যে এতটুকু সন্দেহের অবকাশ নাই। নাকবা প্রলম্বিত হইতেছে বটে, কিন্তু ইহার অবসান ছাড়া আর কোনো বিকল্প নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন