শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। একজন শিক্ষক, একজন সুশিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলার মূল সোপান। পরিবার পরিচর্যার গণ্ডি পেরিয়ে একজন মানবশিশু যার মেধা, জ্ঞান, নৈতিক আদর্শের ছায়া স্পর্শ করে, অনুসরণ করে এগোয়, তিনিই হলেন শিক্ষক। শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিচরণ করলে দেখা যায় যে, একজন শিশু বাবা-মার পর চিন্তা-ভাবনায় যে মানুষটির প্রতি আসক্ত বা নির্ভরশীল হতে আগ্রহী হয়ে উঠে, তিনি হলেন শিক্ষক। কোনো কোনো বিষয়ে বাবা-মার চাইতেও শিক্ষককে তাদের আস্থা ও বন্ধুত্বের ভাগটা বেশি দিয়ে থাকে, স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের অবদানটাই মুখ্য। শিক্ষার্থীর কাছে এ ধরনের গ্রহণযোগ্যতা পাবার নেপথ্যে শিক্ষকের ইতিবাচক গুণাবলী কাজ করে। একজন শিক্ষকের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বই শিশুদের আকৃষ্ট করে সহজে। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষক যা বলেন, যা ভাবেন শিক্ষার্থীরা তা বলতে, ভাবতে ভালবাসেন। মনেপ্রাণে অনুসরণ করে। মানবশিশু শুধু নয় জগতের সকল প্রাণীই পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এ শিক্ষা জন্মের পরবর্তী অবস্থা থেকে এবং শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা মৃত্যু অবধি বহমান। পাঠশালা থেকে উচ্চতর বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের মত মহত্ কাজে শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকতে হয়। ‘শিক্ষক’ মানবজীবনের সবচাইতে মূল্যবান, শ্রদ্ধার একক চিত্র, এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
কিন্তু সেই শিক্ষক সমাজ সম্পর্কে বর্তমান ধারণা কী? অতীতের ধারণা ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে যে ধারণা, তা দুর্ভাগ্যজনক। যা দেখা যায় তা হল, কতিপয় শিক্ষক দ্বারা নারী শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার, দেশের প্রচলিত বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বার্থগত কারণে বিভাজিত শিক্ষক সমাজ, সেলিব্রেটি শিক্ষক হতে কতিপয় শিক্ষকের ভিন্ন রকম ব্যস্ততা, সীমাহীন টাকা কামাইয়ের জন্য শ্রেণীকক্ষের বাইরে কোচিং সেন্টারে নোট পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে কতিপয় শিক্ষকের আগ্রহ, বিলাসবহুল জীবনের প্রতি কতিপয় শিক্ষকের মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি, জাল সনদে শিক্ষকতার মত পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
সর্বশেষ, সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ, জাল সনদে শিক্ষক। যে সনদ দিয়ে চাকরি জুটলো শিক্ষকের, সেটি জাল! নিয়োগ বোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে বা নিয়োগ বোর্ডের কোনো কোনো সদস্যকে ঘুষ দিয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন চাকরি! এমপিওভুক্ত হয়ে এ সকল শিক্ষক ইতোমধ্যে সরকারি তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) হাজার হাজার শিক্ষকদের মধ্যে উক্ত সংবাদ প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত মোট ১৬০ জন শিক্ষকের জাল সনদের খোঁজ পেয়েছেন। যদিও ডিআইএ-এর আশঙ্কা, এই সংখ্যা কয়েক হাজার। সবই সম্ভব একটি দেশে এ আর অসম্ভব কি? মুখ বুজে সংবাদ প্রতিবেদন পাঠ করতে হল। আর চোখ বন্ধ করে নয়, খুলেই দেখলাম অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি দেশ। মূল্যবোধহীন মানসিকতা আর যা-ই পারে, একটি জাতিকে সুশিক্ষিত করে তুলতে পারে না। ফ্লাড লাইট বা সোডিয়াম বাতি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাকে আলোকিত করা সম্ভব, বিবেক নয়। বিবেকের প্রজ্বলনে প্রয়োজন অন্তর আলোর। যে আলো জ্বলতে সহায়তা করেন বাবা, মা এবং শিক্ষক। বড় বেশি পবিত্রতার বন্ধন আর ক্ষেত্র এসব। প্রশ্ন জাগে, আমাদের দুঃসাহস, স্পর্ধা কতটা যে, এমন একটি পেশার পবিত্রতা নষ্ট করতে সক্ষম হই? কিংবা এ রকম একটি অন্যায়, অনৈতিক কাজ করার সুযোগ কেন একটি রাষ্ট্রে থাকবে? জানি না উত্তরটা কার কাছে পাওয়া যাবে? কোথায় পাব? প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাল সনদে শিক্ষকদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হবে। এটা সুসংবাদ নিঃসন্দেহে। কিন্তু এই সুসংবাদ বা প্রক্রিয়া তো গোটা শিক্ষক সমাজকে জাল এর অপবাদ থেকে, দায় থেকে, আমাদের সংশয় থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হবে না। কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের শুদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অরাজনৈতিকভাবে কখনও হয় না, হয়নি। ফলে ধরে নেয়া যায় যে, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা ক্ষমতাসীন মোড়কে বহাল থেকে যাবেন। লোকচক্ষুর কারণে শাস্তির ব্যবস্থা ঘোষিত হলেও তা কতটা কার্যকর হবে তাও সংশয়পূর্ণ ।
কীভাবে রোধ করা যায় এই অনৈতিক, অবৈধ চর্চা ? এখন ডিআইএ যা করছে, তাতে জাল সনদ সনাক্ত করা এবং অবৈধ শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা হয়ত যাবে হাতেগোনার মত। কিন্তু এই অনৈতিক মানসিকতার জন্ম রোধ করা যাবে কী ? যাবে না। কারণ এক্ষেত্রে প্রয়োজন সমষ্টিগত উদ্যোগ, পদক্ষেপ। অনৈতিক মানসিকতা রোধ সম্ভব শুধুমাত্র নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা থেকে। এই চর্চা একাকী করা যায় না। এই চর্চা একের সাথে অপরের এবং সমাজের প্রতি স্তরের। সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এ বিষয়গুলো মূলত আচরণিক এবং যার উত্পত্তি শিক্ষা থেকে। শিক্ষা যত মজবুত হবে, মূল্যবোধ তত মজবুত হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে কী শিক্ষা পাচ্ছি বা দিচ্ছে তার উপরই নির্ভর করবে নৈতিক মূল্যবোধের গড়ন ও গভীরতা। আবার ব্যক্তি ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব যাতে ইতিবাচক হয়ে ব্যক্তি ও সমাজের ভেতর বিস্তার লাভ করতে পারে সেই ব্যবস্থার উদ্যোগ রাষ্ট্রকেই প্রথম গ্রহণ করতে হয়, নিশ্চিত করতে হয়। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত আচরণ জরুরি এক্ষেত্রে। রাষ্ট্রের ভাবনাগুলো জনগণের ভাবনার খোড়াক হয় যেমন, ঠিক তেমনি জনগণের ভাবনা নিয়েই রাষ্ট্রের ভাবনা। পরিপূরক প্রত্যাশা নিয়ে একটি দেশ, একটি জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকে। মূল্যবোধ জন্ম নেয়া বা গড়ে উঠার বিষয়টি শৈশব থেকেই। সুতরাং শৈশবে শিশু কী শিখছে, ধারণ করছে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই শিশুই একদিন বড় হয়ে দেশের নাগরিক পরিচয়ে তার অধিকার ভোগ করবে।
শৈশব থেকে যা শেখা হচ্ছে তা যদি বলি পুরোটাই রাজনৈতিক, ব্যক্তিনিষ্ঠ বিষয়, ভুল বলা হবে কী ? অন্যায় এমন এক বিষয়, যা অন্যায় থেকেই প্রসূত হয় এবং সুযোগে তার বিস্তার ঘটে। যিনি অন্যায় করছেন, তিনিই আরেকজনকে অন্যায়ে উদ্বুদ্ধ করছেন। অতএব সমাজ থেকে অন্যায় দূর করার জন্য ন্যায়সঙ্গত আদর্শের প্রয়োজন এবং তা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত।
লেখক :কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী
