রাজনীতি

ঈদোত্তর রাজনীতির গতি-প্রকৃতি

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫২
বিপুল আনন্দ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেলো ঈদ। এখনো অনেকে ধরে রেখেছেন শেষ আমেজটুকু। বস্তুত, রমজানের ঈদ বাঙালির অন্যতম প্রধান প্রাণোত্সব। সহস্র ঝামেলা অগ্রাহ্য করে, কখনোবা মৃত্যু-ঝুঁকি মাথায় নিয়ে মানুষ ছুটে শেকড়ের সন্ধানে। এ-কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্য নয়। ঈদের একটা ধর্ম-অতিরেক সর্বজনিন ব্যঞ্জনা আছে— অন্তত আমাদের এ দেশে। ঈদের আগে-পিছের দিনগুলোতে যে ঔদার্য ও সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়— সমাজের সর্বস্তরে তা অন্য সময় প্রায় দুর্লক্ষ্য। ৬ ঘন্টার ট্রাভেল করতে লাগে ১২ ঘন্টা, পাঁচশ টাকার টিকেট কিনতে লাগে পনেরশ’ টাকা। রাতভর অপেক্ষার পর ব্যর্থ টিকেট-শিকারীদের অনেকে আবার বাস, লঞ্চ কিংবা ট্রেনের ছাদে বিপজ্জনক বোঝা হয়ে ঘরে ফিরতে চায়। অনেকেরই ফেরা হয় না। তবুও ঈদ বলে কথা। সকল ঝক্কি-ঝামেলা হাসিমুখে সহ্য করে মানুষ। মিলেমিশে ঈদ উদযাপন করে। পরম শত্রুর সাথে কোলাকুলি করে যেন নিবিড় মমতায়। শুভেচ্ছা বাণীতে ভরে যায় মোবাইলের ইনবক্স। হাসিনা-খালেদা দ্বন্দ্বও যেনো ম্লান হতে বসে পরস্পরের শুভেচ্ছা-কার্ড বিনিময়ে। কিন্তু হায়! ঈদকালীন এই উদার মানস কচুর পাতায় টলায়মান বৃষ্টি-বিন্দুর মতো স্বল্পায়ু। অতএব, ফলাফল: যথা পূর্ব্বং, তথা পরং। মাঝখানে কমিক রিলিফের মতো একটা ফেসটিভ্যাল ব্রেক। হাফ ছেড়ে বাঁচার মতো একটা স্পেস। অবশ্য এদেশে সবকিছুই যেনো তরঙ্গায়িত। সমান্তরাল বা সরলরৈখিক নয়। ব্রাজিলের খেলায় হতাশ হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে পারে কেবল আমাদের দেশেই। আবেগের স্ফুটনাঙ্ক আর হতাশার হিমাঙ্ক সর্বদাই আমাদের চলার পথ আচ্ছন্ন করে রাখে। তাই আমাদের রাজনীতিতেও স্থিতাবস্থা প্রায় কখনোই লক্ষ্য করা যায় না। সত্যিই ভাবতে কষ্ট হয়! স্বাধীনতা অর্জনের চার দশকের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। আমাদের একটা শাসনতন্ত্র রয়েছে, সরকার রয়েছে, বিরোধী দল রয়েছে, গণতন্ত্র রয়েছে— কিন্তু কোনো রাজনৈতিক স্থিরতা নেই, যা কিনা একটি বিকাশশীল অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে জরুরি। আমাদের ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাত কেবলমাত্র রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না, বা যাবে না, ভাবলে উদ্বেগের একটা শীতল স্রোত জাতির অর্থনৈতিক মেরুদন্ড বেয়ে সরসর করে নিচে নেমে যায়। মানছি, আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের কোনো সন্তুষ্ট অবস্থান নেই। প্রজাতন্ত্রের জন্ম-সংলগ্ন অনেক মৌলিক প্রশ্নে এখনও আমরা দ্বিধা/বহুধাবিভক্ত। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিপরীতে যারা প্রকাশ্যে কাজ করেছিলো তারা রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সমর্থনপুষ্ট। এ রকম মেরুবিপরীত আদর্শ এবং অনৈক্যের মধ্যে মেলবন্ধন রচনা করে রাজনৈতিক স্থিরতা আনয়নের চেষ্টা সহজ নয়। তাছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলোর দেশপ্রেমহীন ক্ষমতা প্রীতি, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের বিবেকহীন দলসংলগ্নতা, পাক-আফগানপন্থি মৌলবাদীদের উত্থান এবং জামায়াতে ইসলামের রাজনৈতিক অর্থনীতি আমাদের সেক্যুলার ডেমক্র্যাসির অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা নস্যাত্ করছে। শুধু তাই নয়, একই কারণে আজ রাজনীতির সংজ্ঞাও পাল্টে যাচ্ছে। Politics ক্রমাগত চলে যাচ্ছে Politiking-এর অর্থের মধ্যে। যে মহার্ঘ রাজনীতি আর যোগ্য নেতৃত্বের হাত ধরে এদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিলো, সে ধারায় রাজনীতি এবং সে ধরনের নেতৃত্ব এখন নির্বাসিত প্রায়। এখন রাজনীতি মানে নেতা-কর্মী মোটাতাজাকরণ নীতি। এখন রাজনীতি মানে জালাও-পোড়াও করে ক্ষমতা দখল কিংবা পুনর্দখলের নীতি। ক্ষমতার রাজনীতি মানে অতিভোজ, অতিপুষ্টিজনিত স্থূলতা, ভাগ-বাটোয়ারা আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং টিকে থাকার ব্যাকুলতা। অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরের রাজনীতি মানে সুযোগ হারানো, সুবিধে হারানোর ব্যথা, দুর্নীতি ও লুণ্ঠন বঞ্চিত উপখ্যানের ক্ষুধাগ্নি এবং ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের উন্মত্ততা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ-কারণেই ঈদোত্তর রাজনীতির মাঠ ক্ষমতা হারানোদের ক্ষমতা পুনঃদখলের উন্মত্ততার লড়াই এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের ক্ষমতা রক্ষার লড়াই নিয়ে সরগরম থাকতে পারে। উভয়ের এ লড়াই যদি অহিংস, নিয়মতান্ত্রিক আর জনহিতৈষী হয়, তাহলে তা নিয়ে উত্কণ্ঠার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবাবস্থা তা নয়। ইতিমধ্যে ঈদোত্তর রাজনীতি নিয়ে জনমনে উত্কণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিএনপি নেত্রী একাধিক ইফতার সমাবেশে কঠোর আন্দোলনের দামামা বাজিয়েছেন। আপোষহীন নেত্রী নির্বাচনের জন্য মহানগর কমিটি গঠন করেছেন। দলের সহায়ক সংগঠনগুলোর সংস্কারের তত্পরতা চলছে। বিএনপি যুবরাজ তারেক আন্দোলনের ব্যাপারে মায়ের চাইতে অনেক কাঠি সরেস। বিশ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের তিনি শার্দুলের হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে তিনি একই ধরনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা অবশ্য কাঙ্ক্ষিত ফলোত্পাদন করে নাই। এবার তিনি নিশ্চয়ই অতীতের ভুলগুলো শুধরাবার চেষ্টা করবেন। সবমিলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় ঐক্যজোট কোরবানী ঈদের আগে তাদের অবস্থানিক দৃঢ়তা এবং আন্দোলনের সামর্থ প্রমাণের প্রাণপণ চেষ্টা চালাবে, তা আঁচ করতে অসুবিধা হয় না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও এতো সহজে ছাড় দেয়ার পাত্র নয় বলে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আন্দোলনের মাঠে গোল করা বিএনপির জন্য খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। তবে জল ঘোলা হওয়ার মতো অবস্থা তো সৃষ্টি হতেই পারে। সেই ঘোলাজলে মাছ শিকারি কে হবে তা দেখার বিষয়। তবে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনের জন্য সেই অস্বচ্ছ ঘোলাজল যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটাতে পারে। আর সেখানেই আমাদের কনসার্ন। রাজায় যুদ্ধ হয় হোক, কিন্তু উলু খাগড়ার প্রাণ যেনো না যায়। সে কীরকম যুদ্ধ? সহজ উত্তর। এটাই আসল যুদ্ধ। অহিংস, অধ্বংসাত্মক এবং গঠনমূলক রাজনীতি যুদ্ধ। বিএনপি বিরোধী দলে থাক বা না থাক, দেশের একটি অন্যতম প্রধান নিবন্ধিকৃত রাজনৈতিক সংগঠন। বিদ্যমান সরকার ও রাজনীতি নিয়ে আন্দোলন করার এবং জনমত গঠন করার সবটুকু অধিকার তারা সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষণ করে। তাই বলে রাজনীতির নামে সীমালংঘন, সহিংসতা, নৈরাজ্য ও নাশকতা করার কোনো অধিকার কারুর নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে দেশব্যাপী যে নাশকতা সৃষ্টি হয়েছিলো সে ক্ষত এখনও শুকায়নি। সে দায়ভার বিএনপি সহজে এড়াতে পারবে না। তাই বিএনপি ঘোষিত আন্দোলন কতোটুকু বিএনপির নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর কতোটুকু ছিনতাই হয়ে যাবে জঙ্গি-জিহাদী-জামায়াতীদের দ্বারা, সে খবর হয়তো বেগম সাহেবাও ঠিকমতো রাখেন না। তবে তার পুত্রের কাছে অবশ্যই সে খবর থাকবে। আর সেখানেই নাকি মাতা-পুত্রের আন্দোলনের কৌশলগত দ্বন্দ্বের একটা বিষয় লুকিয়ে আছে। বেগম জিয়া হয়তো দলকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে চান, কিন্তু ক্ষমতা উপোসী তারেক তিলার্ধকাল অপেক্ষায় রাজি নন। ছলে, বলে, কৌশলে তার ‘হাওয়া ভবন’ ফিরিয়ে আনা দরকার। তারেকের এই রাজনৈতিক অভিলাষ/উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিএনপির মাঠ-বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিএনপি হাই কমান্ড আন্দোলনের ফরমান জারি করলেও তৃণমূল নেতা-কর্মীর কাছে কোনো নির্দেশনা কিংবা রূপরেখা পৌঁছায়নি। তাদের ভেতরে কোনো কার্যকর প্রস্তুতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এদিকে মহানগর কমিটি গঠন নিয়েও অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছে। এমতাবস্থায় এতো বড়ো একটি আন্দোলনের ভার বহন করার জন্য বিএনপি প্রস্তুত কিনা- সে প্রশ্ন তো থাকছেই। অন্যদিকে আপাতত আত্মরক্ষাপন্থি জামায়াতও অতীতের মতো বিধ্বংসী পদক্ষেপ এ মুহূর্তে নেবে কিনা, সে অনিশ্চয়তাও বিএনপির আছে। এসব বিবেচনায় সম্ভবত বিএনপি চেয়ারপারসন কণ্ঠের স্বরগ্রাম খানিকটা নামিয়েছেনও। বলছেন, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবী আদায় করবেন। খুব ভালো কথা। জামায়াতের খপ্পরে না পড়ে, আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে পথ চললে সাফল্য যদি কিছুটা পরেও আসে, তবে তাও বিএনপির জন্য অধিক মঙ্গলজনক হবে। কিন্তু তার কথা কি কেউ শুনবে? এমনকি তার গর্ভজাত পুত্রও! বলছিলাম রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার কথা। এ ব্যাপারে সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভূমিকাও নেহাত কম নয়। একটি কার্যকর বিরোধী দলের অভাবে সরকার কিংবা সরকারি দল যদি জবাবদিহিতার সীমানা ডিঙ্গিয়ে স্বয়ম্ভু হয়ে ওঠে— ব্রুট সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ ধরে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী (majoriterianist) হয়ে ওঠে; ভিন্ন মত কিংবা পথের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে; প্রতিবাদহীন বোবা কান্নায় যদি একজনও বুক ভাষায়, তবে তা আওয়ামী লীগের মতো একটি মস্ত ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শপুষ্ট একটি দলের জন্য, সর্বোপরি তার রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য কতোটুকু কল্যাণকর হবে, তা ভাববার বিষয়। সমস্যার ক্রাকস যেহেতু একটি স্থায়ী অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পদ্ধতি রচনা করা নিয়ে তাই সে ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া যেতেই পারে। পাঁচ বছর টার্ম শেষ করার পরও তো একটি নির্বাচন করতে হবে। তাছাড়া স্বাধীনতা উত্তর দীর্ঘ সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি কোনো সরকারই প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরু ও মধ্যটা ভালো হলেও পরিণতি ভয়াবহ। তাই অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সর্বজনগ্রাহ্য টেকসই নির্বাচন পদ্ধতি জাতিকে উপহার দিতে পারলে বর্তমান সরকারের জন্য তা হবে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর সে লক্ষ্যে এখন থেকে কাজ করা শুরু করলে এবং প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলে বিএনপি-জোটের আন্দোলনের তীব্রতা কমে যেতে বাধ্য। কমতে বাধ্য সহিংস রাজনীতির পথ। তারপরও যদি কেউ জল ঘোলা করতে চায় এবং সে ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে চায়; গুপ্ত এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় সহিংসতার পথ ধরে, নৈরাজ্য ও নাশকতার ঘেরাটোপে রুদ্ধ করতে চায় অগ্রযাত্রা তাদের জন্য তো আছেই প্রহারেণ ধনঞ্জয়! দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। লেখক: অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন