ঐতিহ্য

হাওর অঞ্চলের জীবন ও সংস্কৃতি

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫২
অপরাপর অঞ্চল থেকে হাওর জনপদের সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনীতির স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মাটির গঠন, জলবায়ু, উত্পাদন, খাদ্যাভ্যাস-সবকিছুতেই রয়েছে পৃথক বৈশিষ্ট্য। বং+আল তত্ত্বের বাংলা অথবা বঙ্গ নামের জনপদটির অবস্থান ছিল আজকের হাওরাঞ্চলেই। মোগল বাদশাহ আকবরের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলার বারভুঁইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতম মসনদে আলা ঈশা খাঁর যাবতীয় খ্যাতি ও কার্যাবলী হাওর জনপদ আবর্তিতই ছিল। ধারণা করা হয়, বখতিয়ার খিলজী বঙ্গ বিজয় করতে এসে রাজধানী জয় করে পরবর্তী সময় যে অঞ্চলে বিপত্তির সম্মুখীন হন, আর এগুতে পারেন নি, সে অঞ্চলটি হল: এই হাওরাঞ্চল; যাকে নিম্নভূমি কিংবা জলাভূমিও বলা হয়ে থাকে। বৃটিশরা যে অঞ্চল নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল এবং ইংরেজ বিরোধী এখানকার ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র বিদ্রোহ, বিপ্লব ছিল স্বার্থক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী-আর্মীরা যে অঞ্চলে দখল বিস্তার করতে পারেনি, তাহল সুবিশাল হাওরাঞ্চল। অত্যুক্তি হবে না যে, নানা কারণে হাওরাঞ্চল হতে পারে বাংলার উন্নয়নের জন্য আদর্শ। সে অর্থে আমাদের ভাবনার প্রসার আবশ্যক। হাওরবাসীর অতীত-বর্তমান, রুটি-রোজগার, জীবন-যাপন, হাঁসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া সর্বোপরি প্রকৃত প্রত্যাশাকে সামনে আনতে হবে। বাংলাদেশে কমবেশি এক সপ্তমাংশ মানুষ হাওর নির্ভর অর্থনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, এক অষ্টমাংশ হাওরাঞ্চলে বসবাস করেন। প্রচুর সম্ভাবনাময় হাওরের উন্নতি ব্যতিরেকে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। হাওরের পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত দিক যেমন রয়েছে, কিছু বিষয়ে অন্য অঞ্চলের সাথে অনুরূপ সমস্যা ও সম্ভাবনাও বিরাজমান। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাওর-সম্পদ দিয়ে কম হলেও দেশের একতৃতীয়াংশ মানুষের জীবনধারা পাল্টিয়ে দেয়া যাবে বলে সুস্পষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করা যায়। হাওর উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন নিমিত্ত বাস্তবতার নিরিখে গবেষণার জন্য ধারণাপত্র তৈরি করা সময়ের দাবি। কোন কোন সংস্থা, ফোরাম হাওর উন্নয়নের জন্য চিন্তাভাবনা চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও ভাবনার জাল বুনছেন এবং তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এ বিষয়ে অনুমান ও বাস্তবতার সমন্বয় সাধনের জন্য বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার। অগ্রগতির প্রয়োজনে এ সম্পর্কিত উপাদান দুর্লভ নয়। দামোদর থেকে নাফ নদ, হিমালয়ের কাছাকাছি থেকে সুন্দরবন তথা সারা বাংলার সবকটি অঞ্চলে হাওরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব। আমাদেরকে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। হাওর সমস্যার প্রকৃতি নিরূপণে সচেষ্ট হতে হবে, অভিজ্ঞতার সুক্ষাতিসুক্ষ দিকগুলোর বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা যাবে নিঃসন্দেহে। বাংলাতো এমনিতেই নদী-বিধৌত, জলাশয়, খাল-বিলে পরিপূর্ণ। অববাহিকা, জলাভূমি ও সকল প্লাবনভূমির প্রকৃতি বিশেষত অর্থনৈতিক বাধা ব্পিত্তি এবং শেষতক সম্ভাবনা প্রায় সমপর্যায়ের, অতএব হাওরের অভিজ্ঞতা অন্য-অঞ্চলেও প্রয়োগ সম্ভব। বছরের পর বছর পলি ও অন্যান্য ভাবে মাটি পড়তে পড়তে সার্বিকভাবে হাওর ‘টান’ (ভরাট) হয়ে যাচ্ছে। নদী ভরাট হলে ড্রেজিং করা যায়, খাল-বিল ভরাট হলে পুনঃ খনন করা যায়, হাওর ভরাট হলে একে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার কি পন্থা তা আজতক কেউ, সংশ্লিষ্ট কোন বিশেষজ্ঞ বলেন নি । হয়তো বিষয়টি নিয়ে তেমনভাবে চিন্তা করার সুযোগ বা প্রয়োজন হয়নি। বলে রাখা ভাল, হাওর এখন আর গামলা আকৃতির নয়, পিরিচ আকৃতির হয়ে গিয়েছে। আরো ভরাট হলে (ভরাটতো হবেই) তা হবে মাটিতে বিছানো পাটির মত। হাওর এলাকায় হাওর সৃষ্টির বহু বছর পূর্ব হতেই মানুষজনের বসবাস। বর্তমানে কেউ হাওর পারের মানুষ, অনেক মানুষ হাওরের ভিতরে বসবাস করেন । ভিতরের জনপদ, গ্রামগুলো বর্ষায় দ্বীপ সাদৃশ্য ও দূর থেকে নয়নাভিরাম বটে । হবিগঞ্জের বানিয়াচং শুধু এশিয়ার বৃহত্তম গ্রামই নয় । পূর্ববাংলার এক সুপ্রাচীন এবং উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক সমৃদ্ধ জনপদ। সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার প্রাচীন গ্রাম সেলবরষের রয়েছে সমৃদ্ধ বহু-বিচিত্র সংস্কৃৃতির নিজস্ব ঐতিহ্য । নেত্রকোনা জেলার ধনুনদী তীরবর্তী গাগলাজোর গ্রামের নৌযান তৈরির ধারাবাহিক ইতিহাস ছিল বর্তমান সময় হতে ৩ শত বছর আগের ৫০০ বছরের। গাগলাজোরের তৈরি যাত্রী ও মালবাহী নৌকা এবং কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুরের তৈরি মালবাহী নৌকার ঐতিহ্যতো ছিলই, চাহিদা ছিল মুর্শিদাবাদ , কলিকাতা ও আসামের নানা অঞ্চল থেকে মায়ানমার পর্যন্ত । এমনকি আসাম ও রেঙ্গুন ( বর্তমান ইয়াঙ্গুন , মায়ানমার) থেকে কাঠ এনে বর্ণিত স্থানের কারিগরেরা নৌকা তৈরি করতেন । তখন ব্যবসায়ী ও সামন্তরাজদের প্রয়োজন হত নৌ-বহরের। নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জস্থ সিয়াধার গ্রামটি হাজার বছরেরও অধিক প্রাচীন । পূর্বোক্ত ১৭৫৯ সালের ভূমিকম্পে গ্রামটির গঠন কাঠামো লণ্ড-ভণ্ড হয়ে যায়। পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদী বিলীন হয়ে গিয়েছে। এই গ্রামের শিক্ষা, গবেষণা কার্যক্রমের ঐতিহ্য ছিল ঈর্ষণীয়। ছিল একদিকে অপ্রচলিত ব্যবসার ধারা , আবার অন্যদিকে নব আবিষ্কৃত এবং ব্যবহারে অনভ্যস্ত দ্রব্যের সমাহার । যা ছিল ব্যবসা ও সেবা খাতের প্রকৃষ্ট নজির। মাছ কমেছে, এখন বাঙ্গালীর খাবার শাক-ভাত, হাওরবাসীদেরও তাই। হিজল করচের বংশ দিন দিন হয়ে গিয়েছে নিপাত । মান্দার ( মাদার ) , মেরা , বরুনের পাত্তা নেই বল্লেই চলে । এখন আর ভেন্না গুটার তেল তৈরি হয় না , শিতল - সেজের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে অনেক আগেই । হারিয়ে যাওয়া বনতুলসীর মাতানো গন্ধের জন্য বয়স্কদের মন কাঁদে। মাটি মানুষ আর পানি নিয়েই হাওরের কারবার (অস্তিত্ব)। এই মাটি মানুষ পানিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে হাওর সম্পদের হূত গৌরব অনেকটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব । সে জন্য যথাযথ টেকসই প্রকল্প হাতে নিতে হবে । সর্বাগ্রে প্রয়োজন হাওর সম্পদের হিসাব-নিকাশ, কি হারিয়েছে, কি ফিরে পাওয়া যাবে । দৃশ্যমান নয় এবং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রূপান্তর যোগ্য অনেক সম্পদ রয়েছে হাওরে । এগুলোর খবর নিতে হবে । বিশেষত হাওর জাতিকে কি দিতে পারবে , দরকার তেমন একটি সন্ধানী কার্যক্রম। সকল হাওর জলাশয় , সকল জলাশয় হাওর নয় এ তত্ত্বটি বুঝতে হবে । হাওরের জন্য পৃথক হাওর উন্নয়ন প্রচেষ্টা থাকাই উচিত, যা নতুন করে বলার অবকাশ নেই । যেখানে প্রয়োজন-প্রেক্ষাপট হাওর মন্ত্রণালয়ের, সেখানে রয়েছে নিষ্প্রাণ বোর্ডের । হাওরবাসীর প্রত্যাশার ঢালি যেন পূরণ হওয়ার নয় । হাওরের মত এক বিশেষ প্রাকৃতিক অঞ্চলের উন্নয়নকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করা অসম্ভব । লেখক: উন্নয়নকর্মী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন