শিশু অপুষ্টির বিপদ

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২২:০৭
দারিদ্র্যপীড়িত উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে আমাদের অধিকাংশ শিশু আবহমান কাল ধরিয়া অপুষ্টির শিকার হইয়া আসিয়াছে। দারিদ্র্য ও অপুষ্টি—একে অন্যের পরিপূরক হইলেও অপুষ্টির সহিত সচেতনতারও একটি গভীর সম্পর্ক রহিয়াছে। সেই সচেতনতার অভাবেই কি আমরা বর্তমানে উন্নয়ন অগ্রগামী হইয়াও অপুষ্টিকে জয় করিবার ক্ষেত্রে পেছনের দিকে ধাবিত হইতেছি? কেননা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বলিতেছে, গত দুই বত্সরে তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুর হার ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়া ১৬ হইতে ১৮ শতাংশে উঠিয়াছে। পাঁচ বত্সরের কম বয়সী প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে দুইজনের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। একটি শিশুর জন্মের পর প্রথম এক হাজারটি দিন তাহার ভবিষ্যত্ গড়িয়া দেয়। এই সময় যদি কোনো শিশু যথার্থ পুষ্টির অভাবে খর্ব ও কৃশকায় হয়, তবে তাহার রেশ তাহাকে সারাজীবন বহন করিতে হয়। শিশুটি তখন অপুষ্টির চক্রে আটকাইয়া যায়। আর ভয়াবহ আশঙ্কার কথা হইল—অপুষ্টির কারণে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশও মন্থর হইয়া যায়। তাহার ফলে শিশুটি যদি মেধার প্রকাশ ঘটাইবার মতো বুদ্ধি নিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াও থাকে, শুধু অপুষ্টির কারণে সে একধরনের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হইয়া যাইতে পারে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনটিতে যেসব কারণ উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহা তো পূর্বেও ছিল। বরং অপুষ্টির হার বত্সর বত্সর ক্রমশ হ্রাস পাইয়াই ১৬ শতাংশে নামিয়াছিল। তবে কী কারণে এই দুই বত্সরে তাহার বৃদ্ধি ঘটিল? অতীতের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে দেখা গিয়াছে, দেশের পাঁচ বত্সরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ অপুষ্টির কারণে হইয়া থাকে। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের সার্বিক পুষ্টি পরিস্থিতি আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল হইতেও অনেক শোচনীয়। কারণ, অপুষ্টি শুধু খাদ্যের অভাবেই হয় না। শিশুপালন ও পুষ্টি বিষয়ে আমাদের প্রচলিত জ্ঞান প্রায় ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানবিরোধী। তাহা- ছাড়া আছে নানা ধরনের কুসংস্কার এবং পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। রন্ধনপ্রণালি এবং খাদ্য পরিবেশনে আমাদের প্রচলিত পদ্ধতিও পুষ্টির অভাবের জন্য অনেকটাই দায়ী। সবজি কাটা হইতে শুরু করিয়া রন্ধন অবধি সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করার ফলে খাদ্যের অনেক পুষ্টিগুণ আমরা হারাইয়া ফেলি। সবজির খোসা ছাড়ানোর সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করা, রান্নার সময় অধিক সময় ধরিয়া সেদ্ধ করা, অতিরিক্ত পাতলা করিয়া সবজি কাটা এবং কাটার পরে ধোয়া, শাকসবজি বেশিক্ষণ পানিতে ভিজাইয়া রাখা—এইরকম অসংখ্য কারণের কথা উল্লেখ করা যায়। আমাদের খাদ্যাভ্যাসও পুষ্টির অপ্রাপ্যতার একটি কারণ। ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য আমরা প্রধানত চাল ও দ্বিতীয়ত গমের ওপর নির্ভরশীল। বিচিত্র ধরনের ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজির ওপর আমাদের খাদ্য নির্ভরতা তুলনামূলক খুব কম, যাহার ফলে সুষম খাদ্যের ঘাটতি থাকিয়া যায়। সুতরাং শস্যখাতে বৈচিত্র্য আনয়নের পাশাপাশি মত্স্য ও পশুসম্পদ খাতেও উত্পাদনের ব্যাপক সাফল্য সৃষ্টি করিতে হইবে। শিশুর জন্মোত্তর পুষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তাহার জন্মপূর্ব পুষ্টিলাভের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃগর্ভে শিশুর অবস্থানকালে মায়ের পুষ্টিই শিশুর পুষ্টিলাভের উত্স। গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিলাভ ব্যাহত হইলে তাহার গর্ভস্থ শিশুও তাহার প্রভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ এখন অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বের মডেল। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও আমাদের সাফল্য বিস্ময়কর। অপুষ্টির সমস্যাটি সেই উন্নয়ন ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে। বিষয়টি ভবিষ্যতের একটি খারাপ ইঙ্গিতও বটে। কারণ অপুষ্টি আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রয়াসের পথে অন্যতম বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইতে পারে। একটি দেশ সমৃদ্ধ হয় তাহার নিজস্ব মানবসম্পদে। অপুষ্টি সেই মানবসম্পদকে শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথকে রুদ্ধ করিয়া দেয়। সুতরাং এই বিষয়ে অবহেলার অবকাশ নাই। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা লইয়া আগাইতে হইবে এখন হইতেই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন