রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২২:০৭
ইউক্রেন সংকটের জের ধরিয়া রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমপ্রতি নূতন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। এই বর্ধিত নিষেধাজ্ঞার ফলে মস্কো সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক, অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, তেল কোম্পানি এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ ঘনিষ্ঠজন বিভিন্ন সংকটে নিপতিত হইবেন। ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্রায়ন বন্ধ, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কোর সরকারকে সুসংহতকরণ এবং ক্রিমিয়ার ন্যায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত আরও কয়েকটি রাষ্ট্রকে রাশিয়ার সঙ্গে অঙ্গীভূত করার ব্যাপারে পুতিনের উচ্চাভিলাষ বন্ধে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে বলিয়া জানা যায়। কোন দেশের ওপর চাপ সৃষ্টিতে অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ নূতন নহে। বলিতে গেলে ইহা একটি শক্তিশালী অস্ত্র। ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশা, রাষ্ট্র ক্ষমতায় কট্টরপন্থিদের বদলে উদারপন্থিদের আবির্ভাব এবং বিশ্বপরাশক্তিগুলির সঙ্গে দেশটির সাম্প্রতিক চুক্তিই তাহার বড় প্রমাণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন, অনুরূপভাবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও ফলপ্রসূ ও কার্যকর হইবে। ষাটের দশকের স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার প্রবল প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা এখনকার রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়াটাকেই অনেকে বড় সফলতা হিসাবে দেখিতেছেন। তাহাছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশ যখন এই ধরনের কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তাহাকে অবহেলা করিবার কোন উপায় নাই। বিশ্বঅর্থনীতির নাটাইটা এখনও যাহাদের হাতে রহিয়াছে, তাহাদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন না হইলে খেসারত দিতে হইবে, ইহাই স্বাভাবিক। ২০০৯ সালে বিশ্বমন্দা দেখা দেওয়ার পর বিশ্বরাজনীতি ও বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের আভাসের কথা বলেন অনেকে। তাহারা এক মেরুকরণের যুগ হইতে বহু মেরুকরণের কথা বলিতে থাকেন। কেহ কেহ ইরান ও সিরিয়ার গণঅভ্যুত্থানে পশ্চিমাশক্তির ব্যর্থতার পর ষাটের দশকের ন্যায় আবার স্নায়ুযুদ্ধের পদধ্বনি শুনিতে পান। ব্রিকস অন্তর্ভুক্ত উদীয়মান দেশগুলি নিয়াও নানা কথাবার্তা চালু আছে বাজারে। সিরিয়া ও ইউক্রেন সংকটকে অনেকে বিশ্বে একক প্রভাব বলয়ের বিপরীতে নূতন প্রভাব বলয় সৃষ্টিকারীদের টেস্টকেস হিসাবে দেখিতেছেন। কিন্তু কথায় বলে, ‘শেষ ভাল যার সব ভাল তার’। শেষ হাসিটা আসলে পুতিন উপহার দিতে পারিবেন কিনা, তাহাই বড় প্রশ্ন। এমনও হইতে পারে যে, শেষ পর্যন্ত তাহাকে আপোষই করিতে হইতেছে। কেননা এই নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার বৈদেশিক অর্থনৈতিক লেনদেন এবং অস্ত্র ও তেল বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হইবে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাশিয়াকে দরকার নাকি রাশিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দরকার তাহা বোঝা যাইবে। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার, নাকি দরকার রাশিয়াকে, তাহারও পরীক্ষা হইয়া যাইবে। আসলে আজিকার পৃথিবীতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মাকড়সার জালের ন্যায় একে অপরকে জড়াইয়া রাখিয়াছে। ইহা ছিন্ন করা সহসা সম্ভব নহে। ইতোমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা শক্তির বিরোধের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আভাস পাওয়া যাইতেছে। অর্থাত্ আপোষ ফর্মুলাই দৃশ্যমান হইয়া উঠিতেছে। চলমান ইউক্রেন সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে জার্মানি ও রাশিয়া একটি গোপন ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়া কাজ করিতেছে বলিয়া খবর প্রকাশিত হইয়াছে ব্রিটেনের সংবাদ মাধ্যমে। জানা যায়, দুই দেশের নেতা অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও ভ্লাদিমির পুতিন এ ব্যাপারে আলোচনাও করিয়াছেন। সবকিছু ঠিক থাকিলে এ ব্যাপারে একটি চুক্তি হইতে পারে। সেই চুক্তি অনুযায়ী ইউক্রেনে স্থিতিশীলতার অংশ হিসাবে দেশটির পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান বন্ধ করিবে মস্কো। রাশিয়া ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখিবে এবং এ ব্যাপারে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হইবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কিয়েভের নূতন বাণিজ্যিক সম্পর্ক আর বাধাগ্রস্ত করা যাইবে না এবং ক্রিমিয়া দখল করিয়া নেওয়ায় রাশিয়াকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। ইহার বিনিময়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলটির হাতে কিছু কিছু বিষয়ে ক্ষমতা ছাড়িয়া দেওয়া হইবে, ইউক্রেন ন্যাটোয় যোগদান হইতে বিরত থাকিবে এবং ক্রিমিয়ার স্বাধীনতা ও রাশিয়ায় ইহার অন্তর্ভুক্তিকে স্বীকৃতি দিবে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়। এসবই কেবল কথা-বার্তার মধ্যে আছে। চুক্তির পরই আসল বিষয়টি প্রতিভাত হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন