আমার প্রিয়জন বেবী মওদুদ আপা। আমাদের বয়সের ব্যবধান অনেক হলেও আমি তাঁকে আপা বলে সম্বোধন করতাম। বেবী আপা আর বেঁচে নেই। ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অনেকদিন রোগভোগ করে গত ২৫ জুলাই (২০১৪) তারিখে মাত্র ৬৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলাইহে রাজেউন)। তাঁর এই মৃত্যু অকালমৃত্যু। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের অঙ্গনে সৃষ্টি হোল এক শূন্যতার।
২০০০ সাল আমার জীবনের এক স্মরণীয় বছর। এই বছরে বেবী মওদুদ আপার সাথে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে তাসমিমা আপার মাধ্যমে। বেবী আপার সাথে যোগাযোগের উপলক্ষ ছিল আমার লেখা ‘ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক’ পাণ্ডুলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশ। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তথা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ও অবদান ‘ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক’ গ্রন্থের বিষয়বস্তু। পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের জন্য আমি তাসমিমা আপার শরণাপন্ন হই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি ট্রাস্ট থেকে পাণ্ডুলিপিটি মুদ্রিত করা যায় কিনা সে সম্পর্কে আলোচনার জন্য তাসমিমা আপা আমাকে নিয়ে যান বেবী মওদুদ আপার কাছে। সে সময় বেবী আপা ছিলেন সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকার সম্পাদক। সাক্ষাতে তাসমিমা আপাকে বেবী আপা ভাবী সম্বোধন করলেন। উভয়ের অন্তরঙ্গতা ও ঘনিষ্ঠতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। পরে আমি জেনেছি বেবী আপা এক সময় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন। পাণ্ডুলিপি প্রকাশের সূত্রেই বেবী আপার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়ে বেবী আপা আমার লেখা ‘বেগম রোকেয়া জীবন ও সাহিত্য’ বইটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেন। আমি তখনও জানতাম না বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সাথে বেবী আপার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা।
‘ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক’ পান্ডুলিপিটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি ট্রাস্ট থেকে মুদ্রিত করা যায় কিনা, বেবী আপার কাছে সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন তাসমিমা আপা। বেবী আপা পান্ডুলিপিটি গ্রহণ করলেন। তিনি যথারীতি পান্ডুলিপি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে অর্পণ করেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সে সময়ে ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী। কিছুদিন পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে গমন করেন। সেখানে তাঁকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিদেশ গমনে পান্ডুলিপিটি তিনি তাঁর সাথে নিয়েছিলেন। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও পান্ডুলিপি তিনি পড়েছেন এবং বিভিন্ন পৃষ্ঠায় মন্তব্য প্রদান করেছেন। বোস্টন থেকে দেশে ফিরে আসার পর পান্ডুলিপি মুদ্রণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অভিমত বেবী আপা জানতে চান। তিনি মতামত দেন পান্ডুলিপি প্রকাশের যোগ্য; তবে আর্থিক সমস্যার কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি ট্রাস্ট থেকে সেটি মুদ্রণের ব্যবস্থা করা সম্ভবপর নয়। পান্ডুলিপি প্রকাশ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার মতামত উত্সাহব্যঞ্জক। তখন পান্ডুলিপি মুদ্রণে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন তাসমিমা আপা। তিনি পান্ডুলিপি মুদ্রণে অর্থানুকূল্য প্রদানে সম্মত হন। তাঁর অর্থানুকূল্যে ২০০০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ‘ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ, ২০০৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে দ্বিতীয় সংস্করণ এবং তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। এই গ্রন্থে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর জীবনের সাথে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় মূল্যবান ছবি বেবী আপা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি ট্রাস্টে সংরক্ষিত এ্যালবাম থেকে প্রদান করে গ্রন্থের সৌকর্য বৃদ্ধি করেছেন। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি এই গ্রন্থের প্রকাশনা কখনই সম্ভবপর হতো না যদি সে সময় বেবী আপা আমাকে সাহায্য না করতেন এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা আপা এটি ছাপার ব্যাপারে সহযোগিতা প্রদান না করতেন।
বেবী আপা একজন সুলেখক। তিনি কয়েকটি শিশুতোষ ও আত্মকথন গ্রন্থ রচনা করেছেন। নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সম্পর্কে তাঁর সম্পাদনায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘রোকেয়া চিরন্তনী প্রতিকৃতি’ গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। বেবী আপার জীবনযাপনে ছিল না আড়ম্বর, তা ছিল সাদাসিধা। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর থেকে দুই পুত্র সন্তান নিয়ে তিনি কষ্টকর জীবনযাপন করেছেন। সরলতা ও অমায়িক ব্যবহারের দ্বারা স্বল্প সময়ের মধ্যে অন্য কাউকে আপন করে নেওয়া ছিল বেবী আপার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আমার অন্তরের নিভৃতে প্রিয়জন বেবী আপার মধুময় স্মৃতি অম্লান।
লেখক: প্রাবন্ধিক
