ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার রেলক্রসিংয়ে গত শুক্রবার ভোর চারটার দিকে বরযাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে খুলনাগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ৪০ জন। তবে আলাদা গাড়িতে থাকায় বর ও কনে রক্ষা পান। এই রেলক্রসিংটি বৈধ হইলেও সে সময় প্রতিরোধক গেট ছিল উন্মুক্ত। দায়িত্বে অবহেলার কারণে ইতোমধ্যে গেটম্যানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হইয়াছে। এই স্থানে দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ, রেলওয়ের আশেপাশের জায়গায় মাছের আড়তসহ নানা অবৈধ স্থাপনা। এইসব স্থাপনার কারণে রেলক্রসিংটি সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। এমনকি আড়ালের কারণে চোখে পড়ে না ট্রেনের হেডলাইটও। ইতোমধ্যে এই ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। আমরা আশা করি, ইহার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ জানা যাইবে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। একইদিন রাজধানীর মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে ট্রেন-কার সংঘর্ষে আহত হইয়াছে তিন যাত্রী। ফলে রেলক্রসিং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
আমাদের দেশে নানা কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। ইহার বড় কারণ হইতেছে রেলক্রসিংয়ের অব্যবস্থাপনা। এইসব ক্রসিং যেন পরিণত হইয়াছে মরণফাঁদে। তবে সব সময় যে দুর্ঘটনা ঘটে, তাহা অবশ্য সত্য নহে। কিন্তু মাঝে-মধ্যে ঘটা কোন কোন দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতই ব্যাপক হয় যে, তাহা সারাদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১১ সাল হইতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী-খুলনা রুটে রেলপথের অরক্ষিত ক্রসিংয়ে ১৪টি দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। এইসব দুর্ঘটনায় মারা গিয়াছেন ১৫ জন এবং আহত হইয়াছেন অর্ধশতাধিক। অন্যান্য রুটেও মাঝে-মধ্যে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটিবার মূল কারণ সারাদেশের রেলক্রসিংয়ের ৮৫ শতাংশই অননুমোদিত ও অরক্ষিত। এগুলিতে গতিরোধক বার যেমন নাই, তেমনি নাই কোন গেটম্যানও। এইখানে কর্তৃপক্ষ শুধু ‘দেখিয়া-শুনিয়া চলিবেন’ শীর্ষক সাইনবোর্ড ঝুলাইয়াই দায়িত্ব শেষ করিয়াছেন। জানা যায়, সারাদেশে রেলক্রসিং আছে ২৫৪১টি। তন্মধ্যে গতিরোধক বার ও প্রহরী আছে মাত্র ৩৭১টি রেলক্রসিংয়ে। বাকি ২১৭০টি রেলক্রসিং অরক্ষিত বা সব সময় খোলা থাকে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়িতেছে।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে অতি অল্প দূরত্বের ব্যবধানে রেলক্রসিং-এর অবস্থান। ইহা অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক। অবৈধ ও অস্বীকৃত রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা কিভাবে বাড়িল তাহা এক বিরাট প্রশ্ন। অবৈধ এক হাজার ১২৮টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের রহিয়াছে যথাক্রমে ৫৪৮ ও ৪৬০টি। সওজ, পৌরসভা এবং চট্টগ্রাম ও বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কল-কারখানার সম্মুখেও রাস্তা বানাইয়া ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিং তৈরি করা হইয়াছে। তাহার মানে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটাইয়া যে যাহার মতো রেলক্রসিং আদায় বা তৈরি করিয়া নিয়াছেন। ইহাতে যাতায়াতে তাহারা সাময়িকভাবে লাভবান হইতেছেন বটে, তবে জনসাধারণের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছেন। রেলওয়ের আইন অনুযায়ী রেললাইনের ওপর দিয়া সড়ক নিতে হইলে আবেদনের পর গেটম্যানের আট বত্সরের বেতন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের অর্থ দিতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয় না। মানা হইলে এত বিশৃঙ্খলা থাকিত না। এই ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে যেমন সমন্বয়ের অভাব আছে, তেমনি আছে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বার, মেয়র বা সরকারি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা। সর্বোপরি জনগণের অসচেতনতাও। আছে খোদ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা। অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় রেলক্রসিংসমূহ হয় বন্ধ করিয়া দিতে হইবে, নয়তো সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণসহ লোকবল নিয়োগ দিয়া সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে হইবে। ইহাছাড়া যথাসম্ভব রেললাইনের আশেপাশে অবৈধ স্থাপনা ও বস্তির অবসান ঘটাইতে হইবে। আমরা আশা করি, এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিবেন এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় সর্বপ্রকার সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।
