প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার ও দূষণমুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলিকে নির্দেশ দিয়াছেন। এই নির্দেশ এবং উহা বাস্তবায়নের বিষয়টি লইয়া স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে সবিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছেন এবং উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছেন, সেইজন্য তাহারা ধন্যবাদার্হ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নদীর যথোপযুক্ত ব্যবহার যে অপরিহার্য এই সত্যটি উপেক্ষা করিবার সামান্যতম সুযোগও নাই। বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই দান করিয়াছে উহার অসংখ্য নদী। চিরচঞ্চলা ও দুরন্ত এই সকল নদী বাংলাদেশের শুধু প্রাকৃতিক শোভাই বর্ধন করে নাই বরং ইহার জলবায়ু, প্রাণী-বৈচিত্র্য এবং সার্বিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকাও পালন করিয়াছে। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর নদী-গ্রাসের মতো নারকীয়তায় এইসব নদী শ্রীহীন শীর্ণকায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অবলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। যে নদীকে ঘিরিয়া আমরা আমাদের পরিবহন খাতকে অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল করিয়া তুলিতে পারিতাম সেই নদী আজ কোনো কোনো মহলের অবিমৃষ্যকারিতায় ও উদগ্র লালসায় মানচিত্র হইতে হারাইয়া যাইতেছে। নদীর সেই প্রমত্ত রূপ ও দুই কূল-প্লাবী রুদ্রভৈরব মূর্তি আজ বাংলাদেশে অতীতের স্মৃতি মাত্র। অথচ হাজারো স্রোতস্বিনীর প্রবহমানতায় বাংলাদেশ একদিন কি নয়নাভিরাম দৃশ্যকল্পই না মেলিয়া ধরিত। উন্নত বিশ্বের কোন দেশে এইরূপ নদী-বৈচিত্র্য থাকিলে উহাকে ঘিরিয়া পর্যটন আর পরিবহনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিত, ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই। আমরাই শুধু দাঁত থাকিতে দাঁতের মর্যাদা বুঝিতে অপারগ। তাই সভ্যতার গা হইয়া বহমান নদীকে আমরা সীমাহীন নির্দয়তায় ধ্বংস করিবার মধ্যেই যেন আত্মপ্রসাদ লাভ করিতে চাই। তাই নদীর উপর সর্বত্র নির্মম পাশবিকতা চলে এই দেশে অবলীলায়।
পৃথিবীর বহু নামী-দামী নগর নদী তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত কিংবা নগরের মাঝখান দিয়া কুলকুল রবে বহিয়া চলিয়াছে অনন্ত যৌবনা নদীসমূহ। রাইন, দানিয়ুব, নীল নদ, দজলা-ফোরাত, শতদ্রু, গঙ্গা, মস্কো নদী কিংবা বুড়িগঙ্গাও এইরূপ এক একটি নগরকে অঙ্গে ধারণ করিয়া বৈচিত্র্যময় বিভা ছড়াইতেছে। আমাদের দেশে অবিশ্যি নদীর প্রতি অবিচারই চলে কেবল! তাই কল-কারখানার যতসব পরিবেশ-বিনাশী বর্জ্য অবলীলায় নদীতে ফেলিয়া এই দেশের একশ্রেণির অবিবেচক মানুষ কেবলই মুনাফা গোনে। অথচ নদী বাঁচিলে যে দেশ বাঁচে এই বোধ ও চেতনা তাহাদের নাই। বুড়িগঙ্গাকে ঘিরিয়া ঢাকাকে তিলোত্তমা নগরীতে রূপান্তরের কত কথাই না এই দেশবাসী দশকের পর দশক জুড়িয়া শুনিতে পাইয়াছে। কিন্তু এ যাবত্ উহা কেবলই কথার কথা হইয়া রহিয়াছে। পরিকল্পনার ‘পরি’ বারংবার যথারীতি উড়িয়া গিয়াছে আর নদী দখল করিয়া দস্যুরা দেশটিকে ভাগাড়ে পরিণত করিতে উদ্যত হইয়াছে।
কিন্তু ইহা চলিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সারসত্যটি উপলব্ধি করিয়াছেন বিধায় বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার ও উহাকে দূষণমুক্তের এই নির্দেশ দিয়াছেন। পাশাপাশি রাজধানীকে ঘিরিয়া বৃত্তাকার সড়ক ও নৌপথ চালুর কথাও বলিয়াছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হইলে রাজধানী ঢাকার পরিবেশের যে রাতারাতি উন্নতি ঘটিবে ইহাতে সন্দেহ কি! পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনে তো বটেই এমনকি শহর ও নদীর সৌন্দর্য রক্ষা ও উহাকে ঘিরিয়া আকর্ষণীয় পর্যটন সুবিধা গড়িয়া উঠিলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হইবে নিশ্চয়ই। উন্নত দেশগুলি এইসব বিষয়কে মাথায় রাখিয়া নদীর সৌন্দর্য বর্ধন ও নৌ পরিবহনের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপপূর্বক পরিকল্পনা প্রণয়ন করিয়া থাকে। তাই লন্ডন, প্যারিস, মস্কো, স্টকহোম সকলকে এত আকর্ষণ করে বৈ কি! ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা প্রভৃতি নদীকে কেন্দ্র করিয়া পরিবেশ দূষণ বন্ধকল্পে কার্যকর ও বাস্তবায়ানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করিলে শহর ঢাকার এক অপরূপ রূপ সুষমা ফুটিয়া উঠিবে। আর আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকিলে ইহা অসম্ভব কোন বিষয়ও নহে। মনে রাখিতে হইবে যে, নদী কিন্তু প্রাণকে চলমান রাখার প্রেরণা বিশেষ!
