দেশের অর্থনীতিতে কৃষিখাতের অবদান ক্রমশ বাড়িয়া চলিয়াছে। একসময় কৃষি এদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হইলেও মোট দেশজ উত্পাদনে ইহার গুরুত্ব হ্রাস পাইতেছিল। কিন্তু অন্যান্য আর্থিক ক্ষেত্রের বিকাশের সাথে সাথে কৃষি উত্পাদনেও ঘটিয়া গিয়াছে বিপ্লব যাহা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ঐতিহ্যবাহী এই খাতটির সামপ্রতিক উন্নয়ন রীতিমত অবাক করিবার মত। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসমপূর্ণ। উদ্বৃত্ত খাদ্য বিদেশে রপ্তানি করিবার পরিমাণও উত্সাহব্যঞ্জক। গত কয়েক বত্সরে বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানের কিছু উদ্ভাবনও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছে। দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করিতে সম্ভাবনাময় এই আর্থিক খাতটির প্রতি বিশেষ মনোযোগ প্রদানের বিকল্প নাই। উত্পাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নানাপ্রকার সার ও কীটনাশক প্রয়োগ নূতন নহে। কৃষিবিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে জৈবসারের পাশাপাশি ফসলে রাসায়নিক সার এবং ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার বেশ কার্যকর। ইহাতে প্রত্যাশিত উত্পাদন যেমন নিশ্চিত হয় তেমনি কৃষকের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটে। পরিবেশে রাসায়নিক সারের কিছু কিছু নেতিবাচক প্রভাব থাকিলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ইহার ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। তবে নানা কারণে প্রয়োজনের তুলনায় সারের উত্পাদন ও সরবরাহ সমস্যা রহিয়াছে। এই বিরূপ বাস্তবতার সুযোগে একশ্রেণির অসত্ ব্যবসায়ী সারে ভেজাল মিশ্রণ করিতেছে। ফলে কৃষক যেমনি আর্থিকভাবে ঠকিতেছে তেমনি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পাইতেছে। এই বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের নাটোর প্রতিনিধির পাঠানো একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, লালপুরের এক সার ব্যবসায়ীর সারে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় তাহাকে জেল-জরিমানা করা হইয়াছে। তাহার কাছে থাকা ভেজাল সারের সকল মজুদ স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নষ্ট করা হইয়াছে। কিন্তু প্রশ্ন হইলো-ইহাতে কি সমস্যার সমাধান হইবে? লালপুরের এই ঘটনাতো বিচ্ছিন্ন কিছু নহে। দেশের অন্যান্য স্থানে যাহারা দীর্ঘদিন ধরিয়া এই ব্যবসা চালাইয়া যাইতেছে তাহারা কি ধরাছোঁয়ার বাহিরে রহিয়া যাইবে? কোনটা আসল কোনটা নহে তাহাই যদি কৃষকগণ না জানেন তাহা হইলে প্রতারিত হইবার সম্ভাবনাই অধিক।
রাসায়নিক সারে এই ভেজাল প্রতিরোধে অব্যাহত নজরদারির প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে-বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে কৃষকদেরও এই ব্যাপারে সচেতন করিয়া তুলিতে হইবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নেই একাধিক প্রশিক্ষিত কৃষি সুপারভাইজার রহিয়াছেন যাহারা কৃষকের সেবায় নিয়োজিত। কিন্তু অভিযোগ পাওয়া যায়, দায়িত্ব পালনে কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তাগণের অনেকেই অমনোযোগী-সেবা পাইতে অনেকে তাহাদের দ্বারস্থ হইলে তাহারা ভ্রূক্ষেপ করেন না। অথচ সার প্রয়োগের সঠিক সময় এবং সারের গুণাগুণ পরীক্ষা কৃষি কর্মকর্তাদেরই কাজের অংশ, কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাগণ যথাযথ দায়িত্ব পালন করিতেছেন কিনা তাহা প্রশ্নসাপেক্ষ। উন্নত দেশসমূহে এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশেও কৃষিকাজে কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত প্রয়াস লক্ষণীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও ইহা সম্ভব হইয়া উঠে নাই। কাজেই কৃষি অধিদপ্তরের সকলকে তাহাদের স্বীয় দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হইতে হইবে। নকল সার সমপর্কে কৃষককে সচেতন করার কাজটি যে তাহাদেরই- ইহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না।
