‘পৃথিবীতে নাই কোন বিশুদ্ধ মানুষ!’

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৪, ২১:৩৮
কালিগঞ্জের বারোবাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসের ছবি দেখে তাকিয়ে ছিলাম বহুক্ষণ। সন্দেহ নেই, ধাক্কার মাত্রা প্রবলই ছিলো। নয়ত এই রকম দিশাহারা পর্যুদস্ত দশা হতো না বাসটার। ভাবি, বহুমাত্রিক কষ্ট এবং আঘাতে আমাদের দশাও ওই বাসটির চেয়ে খুব সূবিধার নয়। পর্যুদস্ত বাসের ছবিটি পত্রিকায় এসেছে; কিন্তু আমাদের দুমড়ানো-মোচড়ানো অন্তরের ছবি পত্রিকায় দেখা যায় না। তফাত এই মাত্র; কিন্তু বিপর্যস্ত দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মনটিই তো টেনে নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে ভারবাহী গর্ধভের মতো। গাজায় রক্তস্নানের যে তাণ্ডব চালাচ্ছে ইসরাইল তাতে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন। তাও তো সয়ে নিচ্ছি। চেয়ে চেয়ে দেখলাম- দুমড়ে মুচড়ে ধসে পড়ল রানা প্লাজা, দেখিয়ে দিয়ে গেল আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি ঐ রকম একটি ফানুস প্ল্যাটফর্মের ওপর। বিজিএমইএ আর তোবা গ্রুপের আশ্বাসে বিশ্বাসী সরল ষোলশ’ শ্রমিকের দশাও কি ওই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটির মতো নয়? হায়! আমাদের এই লাল-সবুজের মানচিত্রের বেশি সংখ্যক মানুষই তো ভাঙ্গা হাড়-পাঁজরার ঠিক ঔ বাসটির মতোই। নির্মলেন্দু গুণ তার ‘কুমিল্লার দিকে যেতে’ কবিতায় একটি দুর্ঘটনাক্রান্ত রেলগাড়ি দেখে লিখেছিলেন- প্রেমাহত রেলগাড়ী! প্রেমে পড়েই ওরকম দুমড়ে-মুচড়ে গেছে! প্রেমাহত রেলগাড়ি বাসের ওপর উল্টে পড়েছে। প্রেমে পড়া মানেই তো এতো উলট-পালট! উল্টে যাওয়া! নষ্ট গাড়ির পাঁজর ভেঙ্গে পথের দুই পাশে পড়ে থাকা! কবিদের বসবাস ইউটোপিয়ার মধ্যে। এরকম করে ভাবতে পারা তাদের পক্ষেই সম্ভব বটে; কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মাপের সাধারণ চিন্তার মানুষ, আমাদের এত শৈল্পিক ভাবনায় পোষায় না। বিবিধ ঘাত-প্রতিঘাত, নাগরিক দুর্ভোগ, দুর্ঘটনা তো আছেই, সেই সঙ্গে উপরি-আঘাতের মতো আছে রাজনৈতিক কথার আঘাত। রবীন্দ্রনাথ, একজন মিনির কথার ঘায়েই জের-বার ছিলেন, আর আমাদের আছে একাধিক মিনি যারা এক দণ্ড কথা না বলে থাকতে পারেন না। প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে চেয়েছিলেন শাসকদের কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকতে পারবে না। এতটা আশা করার সাহস নেই আমাদের, তবু এটুকু তো ভাবতে পারি যে, তারা কথার ঘায়ে আমাদের বুকে নির্মম ছুরি বসাবেন না। চীন কোথায় যাচ্ছে, ভারত কোথায় যাচ্ছে- আর আমরা কোথায় যাচ্ছি। একটুখানি সুখী জীবনের আশায় বিমানের চাকায় চড়ে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরে আমাদের ছেলেরা, মাছ, শাকের ট্রাকে বরফ হয়ে মরে, ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে রাবারের নৌকায় পথ হারিয়ে খাবার এবং পানি না পেয়ে মরে- তবু তারা এই দেশ ছেড়ে যেতে চায়। দিন চলে যায়; কিন্তু আমাদের কোন ফেলিউরই কোন রকম কোন বোধোদয় হয় না। আমাদের চানাচুর ভাজা হয় মবিল মিশ্রিত তেলে। ফলের জুসে ফলের রস ছাড়া আর সব আছে। কনডেন্সড মিল্কের গায়ে গরুর ছবি আঁকা আছে বটে তবে ভেতরে সবই পাম ওয়েল জাত তেল, লাল চালের ভাত মানে ওটা আউশও নয়, ঢেকি ছাঁটা চালও নয়, স্রেফ লাল রং মেশানো চাল (লালেও ভেজাল!)। ঘি, মানে ডালডা, আর ঘি-এর গন্ধ আর রং। মুড়িতে ইউরিয়া, মাছে ফরমালিন। ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড। এসব লিখতে লিখতে নিশ্চয়ই আমাদের সাংবাদিকদের শতভাগ খাঁটি আঙুল ব্যথাতুর হয়েছে। ভেজালের সংস্কৃতি তাদের আঙুল দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে ঠিকই; কিন্তু ভেজালের দাপুটে গায়ে কোনই আঁচ পড়েনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার তেলেভাজা খাচ্ছিলেন। গান্ধীজি সেই দৃশ্য দেখে তাকে বললেন, আপনি জানেন আপনি বিষ খাচ্ছেন? রবীন্দ্রনাথ বললেন, এই বিষ খেয়েই আমি আজ ৬৫ বছর বেঁচে আছি এবং নীরোগ-ই আছি। সব বাঙালির শিরা-উপ-শিরাতেই খানিক রবীন্দ্র-বাতিক আছে। অতএব তারা জেনে-শুনেই বিষ পান করে এবং মেনেও নেয় যে, এটাই তাদের নিয়তি। মনে পড়ছে ভারতের প্রখ্যাত হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. দেবী শেঠির ইন্টারভিউ। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, কী করে হূদপিণ্ড ভাল রাখা যেতে পারে? উত্তরঃ- কম তেল খান। প্রশ্ন, কোন তেল ভাল? উত্তরঃ- কোন তেলই ভাল নয়। যেটাকে ভাল তেল বলে সবাই জানবে, সেটা আসলে ভাল বিজ্ঞাপন নির্মাতার তৈরি ভাল তেল। তো? তাহলে আমাদের হূদপিণ্ড আর শরীরের নানান কল-কব্জা তো সেই জন্মের পর থেকেই দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। এই দুমড়ানো-মোচড়ানো হূদপিণ্ডকে আরো দুমড়ে-মুচড়ে দিতে রাজনীতির জিমে ওয়ার্ম-আপ চলছে। নির্বাচন নিয়ে কত অমৃত বচন যে শোনা যাবে !!! আসলে কে র্নিভেজাল? কে আদর্শ মানুষ? যাকে আপনি ভাববেন সে-ই। কম দুঃখে জীবনানন্দ লেখেননি পৃথিবীতে নাই কোন বিশুদ্ধ মানুষ! সব ভেজাল! সব! লেখক: কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন