খাদ্যে ভর্তুকি কমাইয়া আনা ও মজুদ বিরোধী একটি চুক্তিতে দ্বিমত পোষণ করিয়াছে ভারত। গত ৩১ জুলাই জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক বৈঠকে চুক্তিটি হইবার কথা ছিল। আর চুক্তিটি হইলে উন্নত দেশগুলির জন্য তাহা খুশির কারণ হইতো। ভারতের পিছিয়ে যাওয়ায় তাহাদের নাখোশ হইবার পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতিও অনিশ্চয়তায় পড়িল। একইসঙ্গে ব্রিকস ব্যাংকের পর এই ঘটনায় ভারত আবার পশ্চিমাদের দৃষ্টি কাড়িয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাইয়াছেন যাহাতে ভারত চুক্তিতে উপনীত হইবার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করিতে সম্মত হয়। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্ট জানাইয়া দিয়াছেন, ভারতের এক-চতুর্থাংশ এখনো দরিদ্র। কাজেই উন্নত দেশগুলোর উচিত উন্নয়নশীল দেশের সমস্যাদি আগে অনুধাবন করা। মূলত খাদ্য নিরাপত্তা ইস্যু নিয়াই ভারত এ ধরনের চুক্তিতে সই করা হইতে সরিয়া আসিল। অথচ ভারত বালি ঘোষণায় সম্মতি দিয়াছিল। গত বত্সরের ডিসেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। ঐ সম্মেলনে অনেক দর-কষাকষি করিয়া সদস্য দেশগুলি সমঝোতায় আসিয়াছিল। যাহার ফলশ্রুতিতে বাণিজ্য সহজীকরণ, কৃষি ভর্তুকি ও স্বল্পোন্নত দেশগুলির বিষয় নিয়া বালি ঘোষণা অনুমোদন করা হয়। সম্মেলনে ভারতেরও দাবি ছিল খাদ্য নিরাপত্তার ও কৃষি ভর্তুকি বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান। কিন্তু সম্মতি জানাইলেও ভারতের মূল এজেন্ডা খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলি লইয়া করণীয়গুলি স্পষ্ট ছিল না। কারণ, ব্যাপক সংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী রাখিয়া এই ধরনের চুক্তি করিলে তাহা সামাল দেওয়াও কঠিন হইতো। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলি ভর্তুকি লইয়া চাপ দিলেও সেইসব দেশেও ভর্তুকির হার বেশি বলিয়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলির মনে মনে রহিয়াছে। ভারত তাহা স্পষ্ট করিল মাত্র। ভারতের এই অবস্থানকে আরো দুইটি দেশ- কিউবা ও ভেনেজুয়েলা সমর্থন দিয়াছে।
ভারতের এই অবস্থানে বেশিরভাগ দেশই অসন্তুষ্ট হইয়াছে। বিশেষ করিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ হইতে বলা হইয়াছে, বালি ঘোষণা মানিয়াই আলোচনা অগ্রসর হইতেছিল। বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয়ে আগে চুক্তি হইবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। তদুপরি কৃষি ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস বা খাদ্য মজুদের বিষয়ে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সময়সীমা নির্ধারণ করা আছেই। এই ক্ষেত্রেও ভারতের যুক্তি রহিয়াছে। ভারত বলিয়াছে, বালি ঘোষণা সকল বিষয় নিয়া একত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার (সিঙ্গেল আন্ডারটেকিং) নীতিতে বিবেচ্য এবং কোনো একটি বিষয়ে মতৈক্য না হওয়া পর্যন্ত বাকিগুলি মতৈক্য হইলেও কোনোকিছুই মতৈক্য বিবেচিত হইবে না (নাথিং এগ্রিড আনটিল এভরিথিং এগ্রিড)। আর তাই বাণিজ্য সহজীকরণ নিয়া চুক্তি করিতে গেলে খাদ্য মজুদের বিষয়টিও আনিতে হইবে। ডব্লিউটিওর বর্তমান বিধান অনুসারে, কোনো দেশ মোট খাদ্য উত্পাদনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে পারিবে। তবে তাহা হইবে ১৯৮৬-৮৮ সময়কালের বাজারদরের ভিত্তিতে। ভারত চায় বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার সমন্বয় করিবার নিয়ম যুক্ত করিয়া বিধানটি সংশোধন করা হউক। কেননা, বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম ১৯৮৬-৮৮ সময়কালের তুলনায় বর্তমানে (২০১৩-১৪ সময়কালে) কয়েকগুণ বাড়িয়া গিয়াছে। কাজেই ২৪ বছর আগের দাম ধরিয়া হিসাব করিলে বর্তমান ভর্তুকির পরিমাণ এর অনুমোদিত সীমা ছাড়াইয়া যাইবে। বর্তমানে ভারত কৃষকদের নিকট হইতে চাল ও গম কিনিয়া মজুদ গড়িয়া তুলিতেছে। যাহাতে করিয়া আপত্কালীন বা প্রয়োজনীয় সময়ে সস্তায় তাহা গরীব মানুষের কাছে বিতরণ করিতে পারে। শুধু ভারতই নহে, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে খাদ্য নিরাপত্তার ইস্যুটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিকতর রাজনৈতিক ইস্যুও বটে। সেই কারণেই ভারত বলিয়াছে, আগে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে একটি স্থায়ী সমঝোতায় আসিতে হইবে। তাহা হইলে বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয়ে চুক্তি করিতে কোনো বাধা থাকিবে না। খাদ্যে ভর্তুকির ব্যাপারে ভারতের অবস্থান নিয়া কাহারো কাহারো ভিন্নমতও রহিয়াছে। এই ধরনের মতাবলম্বীদের মতে, ভারতের উচিত ছিল সেবাখাতে বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে বেশি জোর দেয়া। ভারত যেইভাবে খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিতে চাহিতেছে, তাহা সঠিক নহে। বাজার হইতে উচ্চমূল্যে খাদ্যশস্য ক্রয় করিলে বড় কৃষকই তাহার সুবিধা পাইবে। যাহা ভর্তুকি মূল্যে রেশন দোকানের মাধ্যমে বিক্রয় করা হইবে। এই ধরনের ব্যবস্থা অদক্ষতাই শুধু নহে, দুর্নীতিপ্রবণও বটে। খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়াইবার জন্যও ইহা দায়ী। বরঞ্চ ভোক্তাকে নগদ অর্থ হস্তান্তর করিলে অধিক ফলপ্রসূ হইতো এবং তাহা ডব্লিউটিওর বিধানের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ হইত। আবার অনেকেরই অভিমত, নগদ অর্থ দুর্নীতির জন্য সহায়ক।
ভারতের আপত্তির কারণে যে চুক্তিটি হইলো না বিশ্ব বাণিজ্যে তাহার প্রভাব কি হইবে সে প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভারতই নয়, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলির জন্য ইহার প্রভাব কি হইবে তাহাও আলোচ্য হওয়া যৌক্তিক। এখন ধনী দেশগুলি কিছুটা অজুহাত দাঁড় করিবার সুযোগ পাইলো। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলির জন্য জনশক্তি রফতানিসহ সেবা খাতের বাণিজ্যে যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল সেগুলি সংকুচিত হইয়া যাইতে পারে। নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাহাদের অনাগ্রহ থাকিবে।
