বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের তথা বরিশাল বিভাগের মানুষ আবহমান কাল ধরিয়া প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া টিকিয়া রহিয়াছে। তাহারা টিকিয়া থাকিতে জানে এবং সম্ভবত ইহাও জানে, কীভাবে স্বল্প সুযোগের মাঝেও অন্যদের তুলনায় অধিক যোগ্যতা প্রমাণ করা যায়। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরিয়া এইভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায় শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে। বাস্তবতা অবশ্য মর্মপীড়া জাগায়। গত সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে, বরিশাল বিভাগে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেই হারে বৃদ্ধি ঘটিয়াছে, পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারও বাড়িয়াছে একইভাবে। অথচ এই দুই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের সহিত সমহারে বৃদ্ধি ঘটা উচিত ছিল, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা’ কিন্তু ইহা সেই হারে বাড়ে নাই।
সাধারণভাবে মনে হইতে পারে, দেশের সর্বত্র নিশ্চয়ই একই চিত্র। কিন্তু তাহা ঠিক নহে। কেননা, গত তিন বত্সরে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় টানা পাসের হারে প্রথম ছিল বরিশাল বোর্ড। এসএসসি ও এইচএসসি’র চিত্রও প্রায় একই। ক্রমান্বয়ে পাসের হার বাড়িয়াছে, সাক্ষরতার হারেও আগাইয়াছে বরিশাল বিভাগ। অধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হইল—২০১১ সালে সাক্ষরতার সরকারি তথ্যানুযায়ী সারা দেশে যেখানে গড় সাক্ষরতার হার ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ, সেইখানে বরিশাল বিভাগের সাক্ষরতার হার প্রায় ৬২ শতাংশ! অথচ পরিতাপের বিষয় হইল—সারা দেশের গড় চিত্রের তুলনায় বরিশাল বিভাগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এই গ্রাফ চিত্রের বিপরীত প্রায়। অর্থাত্ ন্যূনতম সুযোগে এই বিভাগের অধিবাসীরা সারা দেশের তুলনায় তাত্পর্যপূর্ণভাবে যোগ্যতা প্রমাণে অগ্রগামী।
ধান নদী খাল —এই তিনে বরিশাল। একদা এই বরিশালই ছিল বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার। এখনও বরিশাল অঞ্চলে বহু বিচিত্র ফসল উত্পাদিত হইয়া থাকে। তবে সেচ সুবিধার সমপ্রসারণ ও আধুনিক চাষাবাদের সুবাদে দেশের অন্যান্য জেলাতেও কৃষি উত্পাদন বাড়িয়াছে। সেই তুলনায় বরিশাল বিভাগে অগ্রসরতার প্রত্যাশিত ধারাটি নিশ্চিত করা যায় নাই। জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ এখনও অসচ্ছল। একই কারণে এখানকার শিক্ষার্থীদের অনেকের পক্ষে রাজধানী কিংবা দূরের কোনো শহরে গিয়া পড়াশোনা করা দুরূহ। সুখের কথা এই যে, টানা ৩২ বত্সর আন্দোলন করিবার পর বরিশালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও, বরিশাল বিভাগের শিক্ষা পরিকাঠামো তথা সুযোগ-সুবিধার চিত্র এখনও যথেষ্ট উত্সাহব্যঞ্জক নহে। অথচ যেকোনো অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে প্রবেশের সুযোগ করিয়া দেওয়ার অপরিহার্য শর্ত হইল শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্টে বরিশালের শিক্ষার্থীদের মেধা ও অধ্যবসায়ের যেভাবে প্রতিফলন দেখিতে পাওয়া যাইতেছে, সেই বিচারেও বরিশাল বিভাগে আরও অধিক সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাবি করিতে পারে। এই বিভাগে যদি তুলনামূলক বিচারে যথেষ্টসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকিত, তাহা হইলে সাফল্যের গ্রাফচিত্র নিশ্চয়ই আরও ঊর্ধ্বমুখী হইত। তবে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়াই একটি বিভাগের শিক্ষার বঞ্চনা হ্রাস করা যায় না। স্কুলের সংখ্যার সহিত উপযুক্ত পরিকাঠামো, শিক্ষকের ঘাটতি (সংখ্যাগত ও গুণগত) ইত্যাদি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাত্ শিক্ষা প্রদানের গুণগত মানও বজায় রাখাটা জরুরি। মফস্বল আর মহানগরে এইকালে সমমানের শিক্ষার সুযোগ যেন অকল্পনীয় বিষয় হইয়া উঠিয়াছে! আর সেই কারণেই সামাজিক সাম্যের বিপরীতে দিন দিন অসাম্য বৃদ্ধি পাইতেছে।
খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের নিশ্চয়তাহীন মানুষের সংখ্যা বরিশাল বিভাগেই সর্বোচ্চ। সেইখানে ‘শিক্ষার অধিকার’ লইয়া মাথা ঘামাইবার মতো ফুরসত্ মেলে না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। কিন্তু শিক্ষাই কেবল রচনা করিতে পারে সব ‘অনিশ্চয়তা’র মধ্যে ‘নিশ্চয়তা’র সোপান। পারে অন্ধকারে আলোকশিখা জ্বালাইতে। শিক্ষার শক্তি জাদুকরি এবং তাহা পরীক্ষিত। সুতরাং সেই শিক্ষার অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ পাইয়াও যাহারা অন্যদের তুলনায় ভালো ফলাফল করে, তাহাদের বঞ্চিত করিবার কোনো যুক্তি থাকিতে পারে না। উন্নয়ন এবং গুণগত উত্?কর্ষ নিশ্চিতকরণ ছাড়া বরিশাল বিভাগের প্রকৃত উন্নয়ন কখনই সম্ভব হইবে না। সুতরাং এতদিবষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের সুদৃষ্টি মিলিবে—আমরা এই আশা করিতেই পারি।
