এই মনোবৃত্তি মানিয়া নেওয়া যায় না

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৯
দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও বগুড়ার সান্তাহার জংশনে শত শত কোটি টাকার রেলওয়ে সম্পদ বিনষ্ট হইতেছে। পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, ঐ দুই স্থানে ট্রেনের সারি সারি লাল রঙের মালবাহী বগি ও যাত্রীবাহী কোচ পড়িয়া রহিয়াছে। কোনপ্রকার সদ্ব্যবহার না করায় মরিচা ধরিয়া নষ্ট হইতেছে বগিগুলি। আট শতাধিক বগি এইভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলিয়া রাখা হইয়াছে যাহার মূল্য হাজার কোটি টাকা। আমাদের রেল পরিবহনের মতো এমন সম্ভাবনাময় একটি খাতকে স্বাধীনতার পর হইতে যেভাবে চরম কর্তৃপক্ষীয় ঔদাসীন্য ও অবহেলার শিকার হইতে হইয়াছে উহা রীতিমত বিস্ময়কর। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রেল পরিবহনের উপর নানান বাস্তবোচিত ও যৌক্তিক কারণেই গুরুত্বারোপ করা হইয়া থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে সেই ব্রিটিশ আমলে যে রেল পরিবহন ক্ষেত্র গড়িয়া তোলা হইয়াছিল উহার সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন এবং যুগোপযোগী করিয়া তোলার ব্যাপারে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বরং অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী আর যাত্রী ও মাল পরিবহনে অধিক নিরাপদ এবং সুলভ এই খাতটি বরাবরই চরম অবজ্ঞার শিকার হইয়াছে। সান্তাহার ও পার্বতীপুরে যে হাজার কোটি টাকার বগি রোদে, তাপে, ঝড়ে-বৃষ্টিতে বিনষ্ট হইতেছে। উহাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা খুশি। কেননা, পুরাতন বগি মেরামতের পরিবর্তে উহাকে ত্বরিত বিনষ্ট করিতে পারিলেই নতুন বগির জন্য অর্থ বরাদ্দ আসিবে আবার তখন লুটপাটের মোচ্ছব বসানো যাইবে। আর এই মানসিকতাতেই আচ্ছন্ন বিধায় রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদারগণের নিকট জনগণের হাজার কোটি টাকার সম্পদের এই অকাল বিনষ্টি কোন আবেদন কিংবা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এই মানসিকতা শুধু অন্যায়ই নহে ইহা রীতিমত শাস্তিযোগ্য অপরাধও। কিন্তু কে কাহাকে শাস্তি দিবে? যাহারা শাস্তি দিবেন, তাহারাই যদি এই অন্যায় কার্যের উত্সাহদাতা অংশীদার এবং ইহা হইতে কিছু উপরি আদায়ের বন্দোবস্ত পাইয়া যান তাহা হইলে জনগণের সম্পদ এইভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইতেই থাকিবে বৈকি! এই চিত্র যে শুধু রেলওয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তাহা নহে। আমরা দেশের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারসমূহ, হাসপাতাল বা ক্লিনিকের বহু মূল্যবান আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও বিআরটিসি বাসের ক্ষেত্রেও ঐ একই চিত্রই দেখিতে পাই। একটি দেশ, রাষ্ট্র ও গণবিরোধী অপশক্তি একইভাবে গোটা অর্থনীতিকে যে কুরিয়া কুরিয়া খাইতেছে উহাতো প্রতিদিনের সংবাদপত্রের বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদনগুলি আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে। কিন্তু এই ব্যাপারে অর্থাত্ ইহার প্রতিকারের ব্যাপারে কোন কার্যকর ও অর্থবহ উদ্যোগ দেখাই যায় না। ‘সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল’—এই হীন মানসিকতা আর এ দেশের হতদরিদ্র মানুষের শরীরের রক্তের বিনিময়ে ক্রয়কৃত এই রেল-বগি, যন্ত্রসামগ্রী ইত্যাদি মুষ্টিমেয় কিছু পরগাছাতুল্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদর পূর্তির কাজে ব্যবহূত হইবে ইহাতো মানিয়া নেওয়া যায় না। দুর্নীতির যে কত শাখা-প্রশাখা এই দেশে বিস্তার লাভ করিয়াছে উহার কোন ইয়ত্তা নাই। নিজ দেশের প্রতি এই ধরনের বিমাতাসুলভ আচরণ যাহারা করে, তাহারা মানুষ হিসাবে কত নিকৃষ্ট, উহা কি বুঝাইয়া বলার প্রয়োজন পড়ে? স্বাস্থ্য বিভাগ বা রেলওয়ে বিভাগ কিংবা এম্নি অন্য সকল বিভাগেই এই অপচয় দেদারসে চলিতেছে। মেরামত করিয়া মালবাহী বা যাত্রীবাহী বগিগুলিকে কাজে লাগানোই যেখানে কর্তব্য সেখানে কেবল লুটতরাজ বজায় রাখিতে চলে এই অবজ্ঞা, অনীহা ও সীমাহীন ঔদাসীন্য। এক্ষেত্রে এক একজন কেরানী, ঠিকাদার, রাতারাতি কিভাবে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়িয়া তুলিতেছে উহাও নিশ্চয়ই কাহারও দৃষ্টি এড়ায় না। তবুও সকলেই নির্বিকার। ইহাকেই যেন বিধিলিপি রূপে মানিয়া লইয়াছে সবাই! রেলের অভ্যন্তরে দুর্নীতি, অব্যবস্থা আর লুণ্ঠন কী হারে চলে উহা বুঝিতে রকেট সায়েন্সের জ্ঞানের দরকার পড়ে না। একটু চোখ-কান খোলা রাখিলেই উহা দেখিতে ও শুনিতে পাওয়া যায়। সাধারণেরা যাহা শুনিতে বা দেখিতে পারেন তাহা আবার যাহাদের শোনার বা দেখার কথা এবং এজন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার হইতে বেতন-ভাতা পাইয়া থাকেন তাহারা থাকেন চক্ষু মুদিয়া আর কানে তালা দিয়া। অতএব, এই অব্যবস্থা-দুর্নীতির প্রতিকার কি? একদিন হয়তো জনগণই প্রতিকারের পন্থা বাছিয়া লইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন