উচ্চশিক্ষার মান :দরকার সুষ্ঠু পরিবেশ ও সমন্বয়

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২০:৫০
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর টি. ডব্লিউ শোজ বলেন, বিশ্বের যত কাজে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে তার মধ্যে সবচাইতে উত্কৃষ্ট বিনিয়োগের খাত হল শিক্ষা। এই ধারাবাহিকতায় যুগে যুগে শিক্ষা বিস্তার মানুষকে আলোকিত করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছে বার বার, যার অংশীদার বাংলাদেশও। বৃটিশ আমলে এই অঞ্চলের বর্ধিষ্ণু মুসলমানগণ উচ্চশিক্ষার জন্য আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় যেতেন, যদিও ঢাকায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলায়। সেই আলীগড়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরধারীরা অনেকে বেঁচে আছেন আবার কেউ কেউ প্রয়াত। পাকিস্তানোত্তর দেশের উত্তরাঞ্চলের একমাত্র উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কিছুদিন পড়ার সুযোগ হয়েছিল এবং সেই সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক যিনি আলীগড়ের ছাত্র আমাদেরকে উক্ত বিষয়ে ক্লাস নিতেন যা এখনও স্মৃতিপটে অম্লান হয়ে আছে। সেই শিক্ষকের নাম প্রফেসর সিরাজুল আরেফিন যিনি সিলেট অঞ্চলের লোক ছিলেন। যাই হোক, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যার মধ্যে তিনটি ছিল সাধারণ শিক্ষার ও বাকি দুটি ছিল কারিগরি শিক্ষার বিশ্ববিদ্যালয়। যেগুলো প্রত্যেকটিই বৃটিশ পদ্ধতিতে শিক্ষার আদলে পরিচালিত। শিক্ষার মানের দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড; কিন্তু সময়ের আবর্তে এই অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে বিশ্বের মানচিত্রে একটি নতুন স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ সৃষ্টির মর্যাদা দিয়েছে সত্যি কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটলেও মান নিয়ে প্রশ্নটা সময় সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। কারণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিকসংখ্যক ছাত্র ভর্তির চাপ থাকায় ছাত্রের ইচ্ছা অনুসারে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া এবং মেধাবী শিক্ষকদের ক্রমাগত স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো ইত্যাদির ফলে বিশেষত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের দায়িত্বের মূল যে তিনটি স্থান-শিক্ষা পাঠদান, গবেষণা ও সমপ্রসারণ এগুলো অনেকাংশে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার এর উপর পড়েছে বিশ্বায়নের যুগে বাজার অর্থনীতির প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমের উপর যা মূলত নর্থ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে শিক্ষা কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর নামান্তর। এটা মূলত বৃটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে বাংলাদেশের আদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যারা মূলত বৃটিশ আদলে শিক্ষা ব্যবস্থার ধারক-বাহক সেগুলোও সময়ের প্রেক্ষিতে তাদের কাঠামো মানবীয় মূল্য চাহিদা নিরিখে ধরে রাখতে পারছে না। এই ধরনের একটি অবস্থায় শিক্ষা একটি সামাজিক উপকরণ (social commodity) থেকে সরে গিয়ে বাণিজ্যিক উপকরণ (business commodity) হিসাবে এসেছে এবং নব্বই দশক থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি যে অগণিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেছে তারাই এই ধারণাটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলে বিবেচিত বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৭টি যেখানে ১,৯৭,২৭৮ জন শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৯টি যেখানে প্রায় চার লাখের কাছাকাছি বা অধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। তাছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭টি অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২,৬৮,৪৫০ ও দূর শিক্ষণ পদ্ধতিতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধনকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬,৭৮,৩৮৭। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অধিভুক্ত ৩৪৭টি মাদ্রাসা রয়েছে যার শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৪,৮৪,৬০৬ জন (উত্স: বিশ্ববিদ্যালয় মজুরী কমিশন) সরকারিভাবে বলা হয়ে থাকে দেশের শিক্ষার হার শতকরা ৬০ ভাগ। কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার কিংবা সুশিক্ষিতের হার কত ভাগ তা নিয়ে তেমন কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। আমরা যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা বাদও দেই তথাপি আঞ্চলিক মানদণ্ডের গুণগত বিচারে বাংলাদেশ মোটেও সম্মানজনক স্থানে নেই। কারণ উচ্চশিক্ষার পেশায় বিশেষত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেধারী ছাত্ররা শিক্ষক হয়ে আসতে চায় না কেবল সত্ভাবে বেঁচে থাকার আর্থিক সাপোর্ট (acceptable compensation package) এর অভাবের কারণে। যদিও সরকার শিক্ষা বাজেটের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাজেট দিয়ে থাকে তথাপি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পদ থেকে আয় বাড়িয়ে যেমন ছাত্র বেতন ইত্যাদি সার্বিক খরচে যে কিছুটা সংযোজন হবে তেমন কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। কারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বেতন, পরীক্ষার ফি, ছাত্রাবাস/আবাসন খরচ সবটুকুই সাবসিডিনির্ভর বিধায় যখনই ছাত্র বেতন বাড়ানো হয় কিংবা নিজস্ব সম্পদ থেকে খরচ মেটানোর কথা বলা হয়, তখনই শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দেয়ার ঘোষণা। এইত গেল প্রশাসনিক দিক কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে সমকালীন যে সমালোচনাগুলো উঠছে তার বেশিরভাগ জুড়ে আছে নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ। যেমন ৩০ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের খবর বের হয়েছে। তাতে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ৬৪ জন ফল ঘোষণা ৭৯ জনের। আবার বেশ কিছুদিন আগে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের খবর ছিল-৫৫ জন ছাত্র প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ যা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল। তাছাড়াও অন্যের প্রবন্ধ নিজের নামে ছাপানো কিংবা অন্যের পি.এইচ.ডি থিসিস জাল করে নিজের ডিগ্রি অর্জন ইত্যাদি ঘটনা প্রায়শই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে শোনা যায় যা ক্ষয়িষ্ণু উচ্চশিক্ষার আরেক কুিসত রূপ যার কোন বিচার নেই। বর্তমান অর্থবছরে ২০১৪-১৫ শিক্ষা উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯,২১৩ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫,৫৪০ কোটি টাকা যা থেকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার কোন কোন সময় উপাচার্য ক্ষমতাবলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বরাদ্দের বাইরে গিয়েও শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকেন যা বরাদ্দের বহির্ভূত হলেও উন্নয়ন খাত খেকে অর্থ এনে শিক্ষকদের বেতন- ভাতাদির খরচ যোগান দিয়ে থাকেন। এই সকল বিশেষ প্রশাসনিক কাজ কিন্তু সাধারণ ছাত্রদের শংকিত হওয়ার কারণ হলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোর শিক্ষকরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা চাহিদা পূরণ করতে সমপূর্ণভাবে ব্যর্থ আর মানসম্মত শিক্ষার কথা বাদই দিলাম। ফলে এই ঘাটতি পূরণের জন্য তাদেরকে প্রাইভেট টিউটর কিংবা কোচিং সেন্টারে যেতে হয় যা আমাদের শিক্ষা বাণিজ্যের আর একটি রূপ। ফলে শিক্ষা যদি হয় পণ্য তাহলে অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় বাজার থেকে যে পণ্যটি কিনছে শিক্ষার্থীরা সেটা মোটেই লাভজনক নয়। এই লাভ লোকসানের হিসাবে ছাত্রের অভিভাবকবৃন্দ তাহলে কি করবেন? অতি মূল্যে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় বাজার থেকে যে পণ্য শিক্ষা ক্রয় করছে তার লাভ অবশ্যি ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হতেই হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন আসে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে এবং প্রায়শই শোনা যায় অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেশিরভাগ অতিথি শিক্ষক দিয়ে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালায়। কারণ পর্যাপ্ত স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের মত আর্থিক অবস্থা তাদের নেই। এখন প্রশ্ন আসে এই সকল খণ্ডকালীন শিক্ষক কোথা থেকে আসে? খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, এসব শিক্ষক আসে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিক হারে সম্মানীর বিনিময়ে বা চুক্তি ভিত্তিকভাবে। এতে করে মানসম্মত শিক্ষার বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়। কারণ এই সকল শিক্ষক একাধারে তার স্থায়ী পদের প্রতি যেমন সুবিচার করছেন না অপরদিকে আমন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানেও তারা মানসম্মত শিক্ষাদানে অবদান রাখছেন না। ফলে উভয় স্থলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার প্রধান ভুক্তভোগী হলো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এই ধরনের ঘাটতি নিয়ে যখন তারা চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে তখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা তাদের জন্য একটি কঠিন যুদ্ধ হবে যার ফলাফল অনেকক্ষেত্রে অশুভ। তাই এই সকল শিক্ষা পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিজ্ঞানসম্মত সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। অতিথি শিক্ষকের পরিবর্তে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে মালিক পক্ষ বা সরকার পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। এটি মনে রাখা দরকার, একটি মেশিন ছাড়া যেমন একটি ভাল ভোগ্যপণ্য তৈরি হয় না, তেমনি ভাল শিক্ষক ছাড়া ভাল ছাত্র তৈরি হয় না। তাই ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষার্থে ও আগামী দিনের নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সুশিক্ষিত ছাত্র তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত। লেখক :কৃষি অর্থনীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা