বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পাঁচ দফা দাবিতে ঈদের আগের দিন হইতে আমরণ অনশন কর্মসূচী শুরু করেন তোবা গ্রুপের গার্মেন্টস শ্রমিকরা। অনশন দিয়াই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করেন তাহারা, যদিও এই দিনে না খাইয়া থাকাটা সংগত নহে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। গত বৃহস্পতিবার হইতে শ্রমিকরা সারাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট আহব্বান করেন। যদিও এই ব্যাপারে পরে দ্বিমত দেখা দেয় বলিয়া জানা যায়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী তোবা গ্রুপের প্রায় সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী বিজিএমইএ’র নিকট হইতে দুই মাসের বেতন নিয়াছেন। তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানায় শ্রমিক-কর্মচারী আছেন প্রায় দেড় হাজার। ইহার মধ্যে এক হাজার ৪৭৫ জন তাহাদের বেতন উত্তোলন করিয়াছেন। কিন্তু তাহার পরও আন্দোলন থামিতেছে না। গতকালও তাহারা ও তাহাদের সমর্থক অন্য শ্রমিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। তাহাদের আন্দোলন না থামিবার কারণ হিসাবে বলা হইতেছে যে, তাহারা তাহাদের দাবি অনুযায়ী আরও একমাসের বেতন পান নাই। পান নাই বকেয়া বোনাস ও ওভারটাইমও। একটি পয়সাও যদি বকেয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার দাবিতে আন্দোলন করাকে অযৌক্তিক বলা যায় না।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে বলা হইতেছিল যে, গ্রেফতারকৃত মালিক জেল হইতে মুক্তি না পাইলে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বকেয়া পাওনাদি মিটাইয়া দেওয়া সম্ভব নহে। এইজন্য তাহার জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। তাহার পরও কেন সংকটের সমাধান হইল না তাহাই বড় প্রশ্ন হইয়া দেখা দিয়াছে। উল্লেখ্য, গত বত্সরের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ইহাতে ১১১ জন মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। আহত হন আরও ১০৪ জন। এই অগ্নিকাণ্ডের পর আশুলিয়া থানার একজন উপ-পরিদর্শক নরহত্যার মামলা দায়ের করেন। ইহার প্রক্রিয়ায় তাজরিনের এমডি দেলোয়ার হোসেন গ্রেফতার হন। বলাবাহুল্য, আলোচ্য কারখানাগুলির মালিকও তিনি। বলা হয় যে, ব্যাংকে বর্তমানে তাহার কোন টাকা-পয়সা নাই। তিনি দেউলিয়া হইয়া গিয়াছেন ইত্যাদি। কিন্তু এই কথা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া মনে হয় নাই। গার্মেন্টস মালিকদের দেশে-বিদেশে, যেখানেই হউক, টাকা নাই—এই কথা বিশ্বাস করানো সত্যিই কঠিন। যাহা হউক, শেষপর্যন্ত গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ শ্রমিকদের বকেয়া পাওনাদি প্রদানে আগাইয়া আসিয়াছে। যেহেতু এই সংস্থার এই ধরনের কোন ফান্ড নাই, তাই তাহারা চাঁদা উত্তোলনের মাধ্যমে ইহার সুরাহার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই শিল্পের ভাবমূর্তি রক্ষার কথা চিন্তা করিয়া তাহাদের উদ্যোগকে অনেকেই সাধুবাদ জানান। কিন্তু দুই মাসের বেতন দিতে পারিলেও বিজিএমইএ শ্রমিকদের বোনাস ও ওভারটাইমের পাওনার ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করিয়াছে।
শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ও অন্যান্য আইনসম্মত পাওনা প্রদানের ব্যাপারে যাহার গড়িমসি করেন, আমরা তাহাদের সমর্থন করিতে পারি না। শ্রমিক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতাদি না পাইলে তাহাদের বিক্ষুদ্ধ হওয়া ও আন্দোলনে নামিবার ন্যায়সংগত অধিকার রহিয়াছে। আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। শ্রমিকদের কাজ করানো হইলে তাহার নায্য পারিশ্রমিক অবশ্যই দিতে হইবে। মালিক জেলে কি বাহিরে, দেশে কি বিদেশে তাহা এখানে বিবেচ্য হইতে পারে না। কোথা হইতে টাকা ম্যানেজ করা হইবে তাহাও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। শ্রমিক গায়ের ঘাম ঝরাইয়া শ্রম দিয়াছে, তাহার মূল্য দিতে হইবে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ঘাম শুকাইবার আগেই মজুরি প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে, বিশেষত গার্মেন্টস সেক্টরে, এক শ্রেণীর মালিক শ্রমিকের পাওনাদি প্রদানে প্রায়শ অবহেলা প্রদর্শন করিয়া থাকেন। অথচ তাহারা কী কারণে সময়মত বেতন-ভাতাদি দিতে পারিতেছেন না তাহাও বলেন না। আবার বলিলেও তাহা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। কেননা মালিকের চলন-বলনে কিংবা বিদেশে নিজের বা পরিবার-পরিজনের বিলাসবহুল জীবন যাপনে তাহার কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানাই সুষ্ঠুভাবে চলিতেছে। দেশের প্রধান রফতানিমূলক এই খাতটি বৈদেশিক মুদ্রা আনিয়া আমাদের অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চার করিতেছে। কিন্তু গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠান ও তাহার মালিকের জন্য বরাবরই এই সেক্টরকে দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে ও বদনামের বোঝা বহন করিতে হইতেছে। হঠকারিতা যাহাদের স্বভাব, শান-শওকত হইবার পরও তাহাদের আচরণে কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। এই পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নহে।
বর্তমানে তোবা গ্রুপের মালিক জামিনে হইলেও মুক্ত। তাহাকেই তাহার শ্রমিকদের অসন্তোষ দূর করিতে আগাইয়া আসিতে হইবে। এখানে সরকারের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবার কোন অবকাশ নাই। সরকার ও রাষ্ট্রের কাজ হইল, আইন তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতেছে কিনা তাহা দেখভাল করা। কাহারও পক্ষাবলম্বন করা নহে। প্রয়োজনে তোবা গ্রুপের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া হইলেও বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকদের ন্যায়সংগত পাওনা মিটাইয়া দিতে হইবে।
