এক ইসরাইলি সেনা গাজা আক্রমণে যাচ্ছে। যাবার আগে মাকে বলছে- মা আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। আর ফিরে নাও আসতে পারি। যেভাবে হামাস হামলা করছে তাতে আশঙ্কার কারণ আছে। মা বলছে- কেন হামাসরা তোদের হামলা করবে? তোরা তো কোন অন্যায় করছিস না! ফিলিস্তিনি মারা তো কোন অন্যায় নয়। তোরা তো ন্যায়ের যুদ্ধ করছিস। গল্পটি পুরানো। গাজায় ইসরাইলি সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষিতে নতুন করে বলা। গল্পটির ম্যাসেজ হচ্ছে- ইসরাইলি নাগরিক সাধারণের পার্সেপশন বা বদ্ধমূল ধারণা বোঝানো। ১৯৪৮ সালে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা থেকে বিগত ৫৬ বছর ধরে এই গল্প চলে আসছে। এ গল্পের যেন শেষ নেই।
ইসরাইলের টানা প্রায় এক মাস ধরে চলা নৃশংস অভিযানে ব্যাপক রক্তপাত আর বর্বরতার পর গাজা এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপ। কবরের শান্তি বিরাজ করছে গাজায়। চারদিকে ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশ আর লাশ। মিশরের মধ্যস্থতায় গাজার শাসক গোষ্ঠী হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির শুরুতে এ করুণ দৃশ্য গাজা এলাকার। গত এক মাসে এ ধরনের যুদ্ধবিরতি হয়েছে অনেকবার। প্রতিবারেই ইসরাইল ভঙ্গ করেছে প্রতিশ্রুতি। তাই সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হওয়ার সংশয় রয়েই যাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পরপর ইসরাইল গাজা এলাকায় এ ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০০৮ সাল গাজায় বড় ধরনের অভিযান চালায় ইসরাইল। ডিসেম্বরে শুরু করে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২২ দিনের ঐ অভিযানে ১ হাজার ৩শ’ ফিলিস্তিনি নিহত হয়। চার বছর পর ২০১২ সালের নভেম্বরে আবারও রক্তাক্ত অভিযান চালায় ইসরাইল। এতে ১৬৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। হামাসকে দমনের নামে এসব অভিযান পরিচালিত হলেও মূলত এ হামলা প্রতিবাদী ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে।
গত ৮ জুলাই হামাসের রকেট হামলা বন্ধের অজুহাতে গাজার অধিবাসীদের উপর নির্বিচারে বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল। ইসরাইল এ অভিযানের নাম দিয়েছে অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ। নামে প্রতিরক্ষামূলক মনে হলেও কার্যত এটি আগ্রাসন। নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের উপর বর্বর হামলা। এরপর ১৭ জুলাই থেকে শুরু হয় স্থল অভিযান। স্থল অভিযানের লক্ষ্য ছিল গাজার জনসাধারণের বাইরে বের হওয়ার ‘অবৈধ সুড়ঙ্গ পথগুলো বন্ধ করা’। ইসরাইল দাবি করেছে এ ক’দিনে হামাসের ৩২টি সুড়ঙ্গ পথ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার আগপর্যন্ত ২৯ দিনের ইসরাইলি অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৬৭ জন। তাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৪শ’। গাজার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ লক্ষ। সে অনুযায়ী প্রতি এক হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন করে নিহত হয়েছেন এ অভিযানে। লন্ডন ভিত্তিক গার্ডিয়ান এ খবর দেয়।
ভৌগোলিকভাবে ইসরাইল ও মিশরের মাঝখানে অবস্থান গাজা উপত্যকার। ১৯৬৭ সালে আরব- ইসরাইল যুদ্ধে মিশরের কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয় ইসরাইল। ১৯৬৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি অনুযায়ী গাজা থেকে সেনা ও বসতি প্রত্যাহার করে ইসরাইল। কিন্তু চারদিকেই ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ। একজন নাগরিকও বের হতে হলে অনুমতি লাগে ইসরাইলি বাহিনীর। ইসরাইল গাজার সীমান্ত, নৌ ও আকাশপথগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কোন মানুষ বা মালামাল গাজায় ঢোকা বা বের হওয়া- সবই হচ্ছে ইসরাইাল বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে। ইসরাইলের দাবি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এটা অত্যন্ত জরুরি। ইসরাইলের এ অপতত্পরতার কারণে গাজা মূলত অবরুদ্ধ। কট্টর ইসলাপন্থি হামাসসহ অন্য গোষ্ঠীগুলো গাজার মুক্তির জন্য অব্যাহতভাবে লড়াই করে যাচ্ছে।
হামাস একটি প্রতিবাদী সংগঠন। ফিলিস্তিনের কট্টর ইসলামপন্থি সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হামাস। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরাইলী দখলদারির অবসানের দাবিতে ‘ইন্তিফাদা’ বা ফিলিস্তিনি গণজাগরণ শুরুর পর ১৯৮৭ সালে হামাস গঠিত হয়। তারা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য অব্যাহত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাদের উদ্দিষ্ট রাষ্ট্র হবে বর্তমান ইসরাইল, গাজা পশ্চিম তীর নিয়ে গঠিত একক ইসলামী রাষ্ট্র। হামাস প্রাথমিকভাবে দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়। প্রথমত এর সামরিক শাখা ‘ইজ্জেদিন আল কাশেম’ ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র্র সংগ্রাম পরিচালনা করবে। দ্বিতীয়ত সংগঠন ফিলিস্তিনে বিভিন্ন সমাজ কল্যাণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কট্টর ইসরাইল বিরোধী আধ্যাত্মিক নেতা শেখ আহমদ ইয়াসিনের নেতৃত্বে আবদুল আজিজ আল-রাস্তিসি ও মাহামুদ জহর হামাস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৪ সালের মার্চে গাজায় ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন আহমদ ইয়াসিন। পরের মাসেই নিহত হন আবদুল আজিজ আল-রাস্তিসি। সংগঠনটির বর্তমান প্রধান খালেদ মিশাল। ২০০৫ সালে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়ার পরের বছরই ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হয় হামাস। এখনও গাজার শাসন ক্ষমতায় তারা।
বর্তমান হামলার শুরু ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত জুনে ইসরাইলি তিন তরুণকে অপহরণের পর হত্যা করা হয় । এরপর ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। দৃশ্যত এসব ঘটনা অভিযানের কারণ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও বিশ্লেষকরা আরব জাহানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে এজন্য দায়ী করেন। মিশরে ব্রাদারহুড সরকারের পতনকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আজ যদি মিশরের ক্ষমতায় থাকতো মুরসি তাহলে ইসরাইল এ সাহস দেখাতো না। অপরদিকে সিরিয়া ও ইরান পরিস্থিতির জটিলতায় হামাস আপাত সমস্যা মোকাবেলা করছে। যদিও তুরস্ক ও কাতার হামাসকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে তবুও আরব বসন্ত পরবর্তী পরিস্থিতি হামাসের অনুকূল নয়।
গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা বিশ্ব বিবেককে যতোটা নাড়া দিয়েছে ততোটা নাড়া দিতে পারেনি আরব বিশ্বকে। ইসরাইলের রক্তাক্ত হামলা বন্ধে আরব বিশ্ব তথা আরব লীগ এবং ইসলামী রাষ্ট্র সংস্থা- ওআইসি কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন আরব নেতাদের চুপ থাকার বিষয়টি আসলে মুসলিম ব্রাদারহুডের পতনের পরই ঠিক হয়ে গেছে। ঐ সময় থেকেই মূলত মিশর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত- ইউ এ ই ও জর্ডান মিলে একটি বলয় তৈরি হয়েছে। এটি হলো তাদের ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জকারী ইসলামী গণশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই-এর বলয়। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক উইলসন সেন্টারের গবেষক অ্যারান ডেভিড মিলার বলেন, ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আরব দেশগুলো ভয় ও অনীহা এতোই প্রবল যে ইসলামী শক্তির উত্থানকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতা নিয়াহুর চেয়েও গুরুতর মনে করেন তারা। মিলার বলেন, আমি এ ধরনের পরিস্থিতি কখনও দেখিনি, যেখানে অনেক আরব দেশই গাজায় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য বরং হামাসের দিকেই অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব নেতারা আসলে মূক-বধিরের মতন নীরবতা পালন করছেন।
গাজায় এবারের ইসরাইলি অভিযান শুরু হওয়ার পর মিশর যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয়। ঐ উদ্যোগের পর সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ ফোন করেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির কাছে। সিসির কার্যালয় জানায় বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেছেন, গাজার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি ইসরাইলের কোন দোষ দেখেননি। আবদুল্লাহ এ-ও বলেছেন, সামরিক সংঘর্ষের ফলে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা যে রক্তপাতের শিকার হচ্ছে তার জন্য ঐ ফিলিস্তিনিরা কোন ভাবেই দায়ী নয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন বাদশাহ আবদুল্লাহর এ বক্তব্যে ইসরাইলের সংগে সৌদি আরব ও সমমনা দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থানের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। যেখানে ইসরাইলের সাথে তাদের স্বার্থ একই বিন্দুতে। আরব দেশগুলোর বর্তমান বলয়ের নেতৃত্বে থাকা মিশর যেমন রাজনৈতিক ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তেমনি ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থি কট্টর গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আর এখানেই ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর আপাত অভিন্ন অবস্থানের মূল বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
গাজায় ইসরাইলি হামলায় হতাহত ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য মিশরের কর্মকর্তারাও হামাসকেই দায়ী করছেন। গাজায় খাদ্য ও চিকিত্সা সরঞ্জামের প্রকট অভাব থাকা সত্যেও সিসি সরকার মিশর ও গাজার সঙ্গে যোগাযোগের অবৈধ সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করে রেখেছে। বন্ধ করে দিয়েছে সীমান্তে যাতায়াত। গাজার উত্তরাঞ্চলীয় শহর বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা সালহান আল হিরিস বলেন, ‘সিসি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতা নিয়াহুর চেয়ে খারাপ। মিশর আমাদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের চেয়েও জঘন্য ষড়যন্ত্র করছে। সিসি সরকার মিশরে ব্রাদারহুডকে ধ্বংস করছে, এখন হামাসের বিরুদ্ধে লেগেছে। ইসরাইলের সঙ্গে মিশর, সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সমমনা অবস্থান সৃষ্টি হওয়ার আর একটি কারণ হলো ইরান বিরোধী মনোভাব। ইরানের বিরুদ্ধে হামাসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে। নিউইয়ার্ক টাইমসের বিশ্লেষণে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে আরও আরব ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল ফিলিস্তিনি সমস্যা। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ফলে বাস্তুচ্যুত হয় লাখো ফিলিস্তিনি। সে ধারাবাহিকতায় আজ গাজায় নিজ ভূমে বন্দী লাখ লাখ মানুষ। ১৯৪৮ সাল থেকে আজ ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিগত ৫৬ বছরব্যাপী চলছে অব্যাহত ইসরাইল ফিলিস্তিনি সংঘাত। শান্তির অন্বেষায় জাতিসংঘ এবং অন্যান্য শান্তিকামী জাতিসমূহ বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার বড় কারণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তার সহযোগী পাশ্চত্য বিশ্ব। এবারও ওবামা-ক্যামেরুনরা নির্লজ্জভাবে মানবিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী ইসরাইলকে মদদ জুুগিয়েছে। গাজা তথা ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তির জন্য গোটা বিশ্বের সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য। আর ঐ সমন্বিত পদক্ষেপের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে আরব বিশ্বকেই। আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দ্বারা এ পদক্ষেপ সম্ভব নয়। তাই আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে—আর একটি ইন্তেফাদার- আর একটি আরব বসন্তের।
লেখক: প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
