লঞ্চ এম এল পিনাক-৬, ৪ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে মাওয়া লঞ্চঘাট হতে অর্ধ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর মিডপয়েন্টে ডুবে গেছে। ডুবে যাবার মুহূর্তে লঞ্চটির যাত্রী সংখ্যা ছিল ৩০০ জনের অধিক আর লঞ্চটির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা হল ১১৫ জন। নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে ঈদ উদ্যাপন করার পর নির্ভার মনে ঢাকায় কর্মস্থলে ফিরছিলেন যাত্রীরা। ১৬ কিলোমিটারের সামান্য যাত্রাপথ। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাট। দেড়তলা লঞ্চের পুরোটায় যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ। মাওয়া ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছেও তীরে ভেড়া হল না লঞ্চটির। ঢেউ, স্রোতের টান, চালকের অদক্ষতা আর অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে লঞ্চটি ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে সামান্য কাত হয়ে ডুবে গেল। সর্বোপরি প্রশাসনের নজরদারি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে নিরীহ, নিরপরাধ মানুষ মৃত্যুকে বরণ করল!
বিআইডব্লিউটিএ-এর সূত্রে জানা যায়, নদীর এই পয়েন্টটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই ডুবোচরে প্রায় লঞ্চ আটকে যায়, ফলে এই এলাকা দিয়ে বেশিরভাগ লঞ্চ ঘাটে আসে না। ধারণা করা হয় লঞ্চটি তড়িঘড়ি করে ঘাটে ভেড়ানোর জন্য চালক এই ঝুঁকিময় এলাকাটিতেই লঞ্চ চালিয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে, প্রচণ্ড বাতাস এবং স্রোতের কারণে লঞ্চটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলে আসতে পারে। পিনাক-৬-এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা কেতকী ফেরির চালক জানিয়েছেন, প্রচণ্ড স্রোতের বিপরীতে একটি লঞ্চ যেভাবে চালাতে হয়, উক্ত লঞ্চের চালক সেভাবে লঞ্চটি পরিচালনা করেননি। স্রোতের সঙ্গে আড়াআড়ি করে লঞ্চটি চালনা করতে যাওয়ায় এর মধ্যে পানি ঢুকে যায় এবং লঞ্চটি ডুবে যায়।
কথা হলো কেন একটি স্বাধীন এবং সম্ভাবনাময় দেশে এমনি ঘটনা ঘটেই চলবে। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত নৌ দুর্ঘটনায় দশ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে ৫০০টি, প্রতিবেদন পাওয়া গেছে মাত্র ৫টির। ২০ হাজার মামলা দায়ের করা হলেও ২০০ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। সেসব মামলার রায়ে কারো শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। দেশে প্রতি বছর লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলেও সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে পুঙ্খনাপুঙ্খ হিসাব পাওয়া যায় গত দুই দশকের এবং সেই তথ্যও দু’ধরনের। সরকারি পর্যায়ে যে তথ্য পাওয়া যায় বেসরকারি পর্যায়ে পাওয়া যায় তার চেয়ে ভিন্ন তথ্য। বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেল খাত রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে ৬৫৮টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ, নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজার মানুষ। এসব লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণে বিলুপ্ত হয়েছে ৩৯৩টি পরিবার এবং একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে ৬৫৬টি পরিবার। সরকারের সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর (ডস) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী এই গাণিতিক সংখ্যা আরো কম।
৫০০টি তদন্ত কমিটির যে ৫টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে ঝড়ের কবলে পড়া এমভি মিরাজ-৪ যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রতিবেদনটি উল্লেখযোগ্য। ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নৌদুর্ঘটনার পাঁচটি কারণ সনাক্ত করা হয়েছে। কারণসমূহ : এক: নৌযানের কাঠামোগত কারিগরি ত্রুটি ও দুর্বলতা, দুই: নৌযান চালকের দুর্বলতা বা ক্রটি, তিন: নৌযানের স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী পদ্ধতিতে যাত্রী ও মাল বোঝাই করা এবং পাঁচ: ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ত্রুটিপূর্ণ নকশায় লঞ্চ নির্মাণ এবং চালকের অদক্ষতার কারণে ৭০ ভাগ লঞ্চ ডুবি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। লঞ্চ মালিকেরা বিআইডব্লিউটিএ থেকে লঞ্চ নির্মাণের জন্য নকশা পাস করিয়ে নিয়ে ডকইয়ার্ডে গিয়ে নিজেদের সুবিধামত লঞ্চ নির্মাণ করেন। দেড়তলা লঞ্চের অনুমোদন নিয়ে তৈরি করেন তিন থেকে সাড়ে তিনতলা লঞ্চ। অন্যদিকে ২৩ হাজার নৌযানের মধ্যে ২২ হাজার নৌযানের কোনো লাইসেন্স নেই। বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীগঞ্জে গড়ে ওঠা ডকইয়ার্ডে পুরনো নৌযান নিমিশেই নতুন হয়ে যায়। এসব কিছু করা হয় নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের হাতে রেখে।
নিয়মানুযায়ী লঞ্চ নির্মিত হলে সেটি ঝড় বা দুর্যোগের কবলে পড়ে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত কাত হলেও পানিতে ডুববে না, অথচ নকশা না মেনে যেসব লঞ্চ তৈরি হচ্ছে, সেগুলো ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রী কাত হলেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। পিনাক-৬ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়া যে পরিমাণ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন প্রয়োজন তার চেয়ে শতাধিক কম ক্ষমতার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে লঞ্চে। যাত্রীবাহী নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা বা সার্ভে না করার কারণে প্রতিবছরই ঘটছে নৌদুর্ঘটনা। এভাবে শত শত মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। জানা গেছে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য শুধুমাত্র চারজন সার্ভেয়ার রয়েছেন।
একটি প্রতিবেদন থেকে যখন নৌদুর্ঘটনার কারণসমূহ জানা গেছে, তখন এ বিষয়ে কেন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ত্রুটিপূর্ণ নৌযান এখনও তৈরি হচ্ছে। চালকের অদক্ষতার বিষয়টিও আমাদের অজানা নয়। নৌদুর্ঘটনা কমাতে মন্ত্রণালয় প্রাইভেট সেক্টরে নৌযানের ফিটনেস দেখার দায়িত্ব দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ বিষয়টি অবিলম্বে কার্যকর করা প্রয়োজন। অতিদ্রুত ‘নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রকল্পটির’ জট ছাড়িয়ে প্রকল্পটিকে আলোর মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। বিশেষায়িত কাগজের উপকরণের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে এবং স্বজনপ্রীতিতে আচ্ছন্ন না হয়ে ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ আটক এবং ভরা মৌসুমে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। নৌযান পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে সত্, নিষ্ঠাবান, দক্ষ এবং দূরদর্শী হতে হবে। সরকারকে আইনের কঠোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে অটল থাকতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে, যাতে আইনের আলো-ছায়া দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে না যায়। আজ পর্যন্ত নৌযান দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত কারো শাস্তি হয়নি বলেই নৌদুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গভীরভাবে ভেবে দেখা অবশ্য কর্তব্য। বিশ্বায়নের যুগে ব্যক্তির এই অপ্রত্যাশিত, অমানবেতর মৃত্যু কোনা বিবেকবান কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশিত হতে পারে না।
লেখক :প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক, সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি
email : aireen.jaman836 @gmail.com
