বিপদসংকুল নৌ যোগাযোগ

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪১
প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় দুই-একজনের মৃত্যুর ঘটনা যেন অতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। আর ঈদের সময় আমাদের সফল সড়ক ব্যবস্থাপনা বলতে বুঝায় দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা কম হওয়া! কিন্তু নৌপথেও যে বড় ধরনের বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে তা আমরা বলতে গেলে গুরুত্বই দেইনি। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুকে স্বাভাবিক ধরেই এ সেক্টরের দায়িত্বরত হর্তাকর্তাদের সফলতা অর্জনের পথে এবার যেন যমদূত হয়ে দাঁড়ালো ‘পিনাক-৬’ নামক একটি লঞ্চ। অধিক জনসংখ্যার এ দেশে প্রতিদিনের অস্বাভাবিক দুই-একটি মৃত্যু যেন আমাদের টনকে একটুও নাড়া দেয় না। এজন্য আমাদের ভাইবোনদের শত শত লাশের স্তূপ জমে যাওয়া কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই যেন স্বল্প সময়ের জন্য অতিমাত্রায় সজাগ হয়ে উঠি আমরা। তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণ, সংস্কার, আইন সবকিছু যেন ভেসে ওঠে সবকিছু ডুবে যাবার পরে। চলে পদ্মার জলে রুস্তম আর কাণ্ডারিদের দৌড়ঝাঁপ। আর লাশের প্রতীক্ষায় থাকা পদ্মার তীরের স্বজনদের সংখ্যা কমার সাথে সাথে এ ঘটনারও সলিল সমাধি হবে এটাই যেন স্বাভাবিক। দুর্ঘটনা ঘটার পরে আমরা লাশের প্রতীক্ষায় থাকবো নাকি লাশের স্রোত বন্ধে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা দেখবো এটিই এখন বড় প্রশ্ন। ঈদের আগে ও পরে এ নিয়ে চারটি বড় ধরনের লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলো, এ সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে সর্বশেষ পদ্মায় লঞ্চডুবির ঘটনায় শতাধিক লাশের সলিল সমাধি হলো। পত্রিকাসূত্রে জানা যায়, গত ১৫ মে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার দৌলতপুরের কাছে মেঘনা নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে এমভি মিরাজ-৪ নামে একটি লঞ্চ ডুবে যায়। ঐ ঘটনায় নদী থেকে মোট ৫৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও গত ৩০ জুলাই সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায় যমুনা নদীতে নৌকা ডুবে আটজনের মৃত্যু হয়। তার ঠিক দু’দিন আগেই কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে নৌ-ভ্রমণে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১১ জন। ২০০০ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১৩ বছরে দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। এর মধ্যে শুধু এমভি নাসরীন-১ দুর্ঘটনায় ৩৬ শিশুসহ আট শতাধিক প্রাণ হারায়। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই রাতে চাঁদপুরে মেঘনার মোহনায় ঘূর্ণিতে পড়ে দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছিল ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ যাত্রী নিয়ে চলা ওই লঞ্চ। এক হাজার যাত্রীর ধারণক্ষমতা থাকলেও লঞ্চটিতে যাত্রী ছিল তিন হাজার। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ছাড়াও নির্মাণ ত্রুটি, চালকের গাফিলতি এবং বিরূপ আবহাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। ‘পিনাক-৬’ নামক একটি লঞ্চডুবির ঘটনাও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণেই হয়েছে বলে বিআইডাব্লিউটিএ জানিয়েছে? অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের এ দায় থেকে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষই বাদ পড়তে পারে না। সম্প্রতি পিনাক-৬ নামক যে লঞ্চটি প্রায় ৩০০ যাত্রী নিয়ে ডুবলো তার ধারণ ক্ষমতা ছিল ৮৫ জন। এখানে কথা হলো, শুধু পিনাক-৬ লঞ্চটিই কি ধারণক্ষমতার দুই-তিনগুণ যাত্রী বহন করেছে? ঈদের ঘরমুখো মানুষের যাত্রাপথে প্রতিটি লঞ্চই ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করলেও পিনাক-৬ ডুবেছে তার ফিটনেস সমস্যার কারণে ও ফিটনেসবিহীন এরকম অসংখ্য লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করলেও তারা নিরপরাধ কারণ তারা ডোবেনি! পিনাক-৬ লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, তবে পুরো ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন না করে সাময়িক তদন্ত কমিটি ও তার দৌড়ঝাঁপ দুর্ঘটনা রোধ করতে সক্ষম হবে না। একটু গাণিতিকভাবে যদি দেখি, পিনাক-৬ লঞ্চটি যদি তার ধারণক্ষমতার ৮৫ জন করে যাত্রী নিয়ে ওপারে যেত তাহলে ৮ বার এপার-ওপার করতে হতো। ঈদের ঘরমুখো মানুষ কিংবা ঈদের পরে ঢাকামুখি মানুষের জনস্রোত কি এই ৮ বারের এপার-ওপার দিয়ে মিটানো সম্ভব? অতিরিক্ত লোভ হোক আর মানুষের সচেতনতার অভাব হোক প্রয়োজনের তাগিদে বা বাধ্য হয়ে যাত্রী বোঝাই লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে চেপে বসতে হচ্ছে জনগণকে। অন্যদিকে এই জনস্রোতকে নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণেও কেউই তেমন আগ্রহী হয় না। এজন্য অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ঠেকানোর জন্য প্রয়োজন ঘাটে ফেরি ও লঞ্চের সংখ্যা বৃদ্ধি, ঘাট ব্যবস্থা সর্বোপরি সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। পর্যাপ্ততা না থাকলে তদারকির বিষয়টি দুর্বলই থেকে যাবে। প্রকৃতপক্ষে বড় কোনো দুর্ঘটনায় সরকার প্রশাসন যেভাবে নড়েচড়ে বসে, তার কোনো প্রতিফলন সচরাচর দেখা যায় না নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ঘটনায়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন করার জন্য প্রয়োজন সমস্যার তৃণমূল থেকে উপলব্ধি করা। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এবং তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও মাঝে মাঝেই যে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতেই থাকবে, যা আমাদের কারোই কাম্য নয়। এ ধরনের ঘটনার একটি বড় উদাহরণ হতে পারে রানা প্লাজার ট্রাজেডি। গার্মেন্টস সেক্টরের এ ধরনের বিপর্যয় এবং হাজারের উপরে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার পর গার্মেন্টসগুলোর দুর্ঘটনা মোকাবেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অবকাঠামো নিয়ে কয়েকদিন হইচই হলেও তা যেন সবার অগোচরে চলে গেছে। দুর্ঘটনা মোকাবেলায় ধারাবাহিক পদক্ষেপ ও তদারকি না থাকলে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সফলতা পাওয়া যাবে না। আমাদের দেশে প্রায়শই বড় বড় দুর্ঘটনায় শত শত প্রাণ ঝরে যাবার পরে কয়েকদিন তোলপাড় করে দেয়া পদক্ষেপ আর সমস্যা সমাধানের আশ্বাসের বুলি শোনা যায়। কিন্তু সময়ের সাথে ম্রিয়মাণ হয়ে যাওয়া লাশের মিছিলে সবকিছু ঢাকা পড়ে যায়। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়ে লাশ ফিরে পাবার গ্যারান্টিই যেন এখন প্রধান উপজীব্য। কোনো সভ্য দেশ এভাবে চলতে পারে না। শুধু আইন প্রয়োগ আর তদারকি নয়, চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লঞ্চসহ সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পদ্মার এপার-ওপারে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক হতে পারে পদ্মা সেতু, যা দ্রুত নির্মাণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমেই যোগাযোগ ব্যবস্থার এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। সুতরাং সমস্যা সমাধানে স্বল্প সময়ের তত্পরতা নয়, বরং দরকার যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। লেখক :নিবন্ধকার [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন