ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগ ও উন্নয়ন

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪৯
ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড়ে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলিতেছে। এইখানে অনেকের অজান্তে গড়িয়া উঠিয়াছে বহু ক্ষুদ্র শিল্প- কারখানা। জিঞ্জিরার পর এখন বলিতে গেলে গোটা কেরানিগঞ্জ হইয়া উঠিয়াছে ঢাকার শিল্পবিপ্লবের দ্বিতীয় ক্ষেত্র, যাহা জাতীয় অর্থনীতিতে রাখিতেছে অসামান্য অবদান। কয়েক বর্গ কিলোমিটার নিয়া গড়িয়া উঠা এই শিল্পপল্লীতে আছে দুই হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্প-কারখানা। আর এইখানে কর্মরত প্রায় ১২ লক্ষ কারিগর-শ্রমিক। এই ব্যাপারে ইত্তেফাকের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, সুঁই হইতে জাহাজ-অনেক কিছুই তৈরি হইতেছে এইখানে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পোশাকের ৬০ ভাগ চাহিদা মিটাইতেছে কেরানিগঞ্জের এই শিল্পপল্লী। এইখানে তৈরি হইতেছে ৮৫ ভাগ দেশীয় জিন্স। ৩৫টি দেশে রফতানি হইতেছে এইখানকার তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকের চাইতে বড় ব্যাপার হইল, এইখানে দেশীয় বিভিন্ন তৈজসপত্র, ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি, হার্ডওয়্যার সামগ্রী, গাড়ির পার্টস, গৃহস্থালী সামগ্রী, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের জিনিসপত্র, সিরামিক, প্রসাধনসামগ্রী, খেলনা ইত্যাদি তৈরি হইতেছে দক্ষ হাতের ছোঁয়ায়। জাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি তৈরি হইতেছে মিটার গেজ/ ব্রডগেজ রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতে যেইসব ক্যাপিটেল মেশিনারিজ ব্যবহার করা হয়, তাহাও এইখানে তৈরি হইতেছে বিস্ময়করভাবে। ফলে এইক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা খুবই কম। বলাবাহুল্য, এইসব অভাবনীয় কর্মযজ্ঞের নায়ক আমাদের তথাকথিত অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত অথচ দক্ষ কারিগরগণ। গুণে-মানে ও স্থায়িত্বের দিক দিয়াও তাহাদের তৈরি পণ্য যথেষ্টই মানসম্মত। কিন্তু সরকারিভাবে এইখানকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগের কোন মূল্যায়ন নাই বলিলেই চলে। নাই কোন সরকারি পরিকল্পনা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা। ঢাকার ধোলাইপাড়, জিঞ্জিরা ও কেরানিগঞ্জে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মোদ্যোগ চোখে পড়িতেছে তাহা আশাব্যঞ্জক। শুধু ঢাকা নহে, সারাদেশেই এই ধরনের উদ্যোগ দৃশ্যমান। এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি অর্থনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টাই আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি। এই সমস্ত ছোট-খাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণেই আমরা বিশ্বমন্দার পরও তেমন টের পাই নাই। বস্তুত এইসব শিল্প মালিকগণ এখনও সরকারের মুখাপেক্ষি নহেন। তাহারা আত্মনির্ভরশীল ও কঠোর পরিশ্রমী। কিন্তু তাহাদের কোন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা নাই তাহা বলা সংগত হইবে না। তাহাদের সামান্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হইলে তাহারা আরও উন্নতি লাভ করিতে পারিবেন। জানা যায়, আশির দশকে বিসিক জিঞ্জিরার ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশে একশত কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে গ্রহণ করা হইলেও কিছু ঋণ বিতরণের পর তাহা বন্ধ হইয়া যায়। নূতন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। ঋণ সহায়তা ছাড়াও এইখানকার উদ্যোক্তারা প্রায়শ বিদ্যুত্ ও গ্যাস সংকটের কথা বলেন। শিল্প-কারখানায় এই জ্বালানি সংকট নিরসনের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা একান্ত প্রয়োজন। এইখানে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুত্ দিতে পারিলে এই শিল্পাঞ্চল যে আরও গতিশীল হইবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও প্রসারিত হইবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। পৃথিবীতে ক্ষুদ্র বলিয়া কোন কিছুকে অবহেলার অবকাশ নাই। কবির ভাষায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণাই একদিন সাগর-মহাসাগর গড়িয়া তোলে। অর্থনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টার ব্যাপারেও এই কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। চীন আজিকার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। তাহাদের এই অগ্রযাত্রার পশ্চাতে এক সময়কার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিসীম। জাপান ও তাইওয়ানের উন্নতির পিছনেও আছে অনুরূপ শ্রেণীর কর্মবীরদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। অন্যকে নকল করিবার জন্য জিঞ্জিরা ও কেরানিগঞ্জ শিল্পপল্লীর বদনামের কথা বলা হইলেও ইহা সর্বাংশে সত্য নহে। যেহেতু বাংলাদেশ জনবহুল একটি দেশ এবং এসএমই খাত আমাদের মোট শিল্পপণ্যের ৫০ ভাগ উত্পাদনকারী ও মোট শিল্প শ্রম শক্তির ৮০ ভাগ সরবরাহকারী, তাই এই ব্যাপারে সরকারের আরও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন পুঁজি ও কাঁচামাল সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং সার্বিক স্বীকৃতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন