জেলা বাজেট

বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ যে কারণে

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫০
বাংলাদেশের আর্থিক বছর (২০১৪-২০১৫) ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে এবং এই নতুন বছরের বাজেটে দেশের ছয়টি বিভাগীয় সদরের জেলাসহ পূর্ববর্তী বছরের ন্যায় টাঙ্গাইল জেলাকে সম্পৃক্ত করে মোট সাতটি জেলার জন্য ১৯ হাজার ৬৪৯ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা জেলা বাজেটে বরাদ্দের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন- এই নতুন বাজেট পদ্ধতি আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, কারণ মন্ত্রী মহোদয় আরো বলেছেন, ‘আমি সে দিনের স্বপ্ন দেখি যখন জাতীয় বাজেট শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণীত বাজেটই হবে না, বরং এটি হবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চাহিদার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন।’ ঠিক এর আগের (২০১৩-২০১৪) অর্থ বছরে পরীক্ষামূলক ভাবে টাঙ্গাইল জেলাতে একক ভাবে জেলা বাজেটের অংশ হিসাবে ১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় হয়ে ছিল, যার বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তৃতায় আবেগের সুর এবং বাস্তবতার উপস্থিতি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাধারণ নিয়ম অনুসারে একটি জেলা এক বছরে কোন কোন উত্স থেকে কত টাকা আয় করবে এবং কোন কোন খাতে তা ব্যয় করবে তার একটি চিত্র থাকবে জেলা বাজেটে। প্রস্তাবিত জেলা বাজেটে এর কিছুই নেই। এখন একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় প্রশ্ন আসে- গত টাঙ্গাইল জেলা বাজেটের ১ হাজার ৯০৭ কোটি সরকারি টাকা কি হাওয়া হয়ে গেল? নাকি অন্য কিছুতে ব্যয়িত হলো? একদিকে জেলা প্রশাসক অপরদিকে জেলা পরিষদ—কেউই কোনো কার্যকরী দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে বলে মনে হয় না। অথচ এই টাকা উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ হিসাবে জেলাতেই ব্যয়িত হয়েছে বলে প্রতীয়মান। এক্ষেত্রে সরকারের অস্বচ্ছতা বা কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কারণ নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগেই এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দিক চূড়ান্ত করে এই কাঠামোতে কার কতটুকু দায়িত্ব রয়েছে তা নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয়; কিন্তু টাঙ্গাইল জেলা বাজেট বাস্তবায়নে তা ঘটেনি। ফলে জেলা পরিষদ কিংবা জেলা প্রশাসন কেহই সঠিক ভাবে কে কোন পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল—তা অস্পষ্টই রয়ে গেল। অথচ সার্বিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকার কাঠামো হিসাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, জেলা পরিষদকে কার্যকর না করে জেলা বাজেট ঘোষণা ‘লোক দেখানো’ ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানে জেলা পরিষদের অস্তিত্বই নেই সেখানে কীসের জেলা বাজেট? কার কাছে এই বাজেটের দায়ভার দেয়া হয়েছে- এ সকল প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। বস্তুত প্রতিটি জেলাতে উপ-সচিব পদমর্যাদার প্রধান নির্বাহী কর্মকতা জেলা পরিষদের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করে থাকেন এবং স্থানীয় সরকারের অংশ হিসাবে সরকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি জেলা পরিষদের সভাপতি হিসাবে বর্তমানে কার্যকর রয়েছেন। প্রস্তাবিত নতুন বছরের সাতটি জেলা বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় বাবদ ৮ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বাস্তবায়ন জেলা পরিষদগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে, যদি এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়। তবে এই ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনা কি তা এখনো অস্পষ্ট। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সাত জেলার জন্য বাজেট বরাদ্দের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, শুধু নেপালেই পুরোপরি জেলা বাজেট রয়েছে, আর ভারতে রয়েছে district development authority যা কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থের বরাদ্দের আওতায় জেলার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সরকারের কাছে প্রশসানিক ও আর্থিকভাবে জবাবদিহি করে থাকে। তবে সেটা জেলা বাজেটের তত্ত্ব থেকে ভিন্ন। সত্যি কার অর্থে জেলা বাজেট বলতে যা বোঝায় তা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে জেলার জন্য দেয়া বরাদ্দের একটি হিসাব প্রণয়ন শুধু সম্ভব যা বাস্তবে হয়েছে। এখন সরকার যেহেতু জেলা বাজেট নিয়ে সাতটি জেলায় মাঠে নেমেছে সেখানে একক ভাবে প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে কার কাছে দেয়া হয়েছে—জেলা পরিষদ নাকি জেলা প্রশাসন? কারণ দুইটি সংস্থার শ্রেণি চরিত্র ভিন্ন। প্রথমটি স্থানীয় সংস্কার প্রতিষ্ঠানের অংশ, অপরটি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী। এই জাতীয় বিভ্রান্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান বছরের জেলা বাজেটের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা, যার পরিমাণ ৫ হাজার ৬৮২ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা । আর সবচাইতে কম বরাদ্দ পেয়েছে সর্বকনিষ্ট বিভাগ রংপুর বিভাগীয় সদরের জেলা রংপুর- মাত্র ২ হাজার ৮ কোটি টাকা, যেখানে উন্নয়ন খাতে ব্যয় ধরা হলো ৭২৫ কোটি টাকা। এখন আসা যাক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে। ধরা যাক, গড়ে ৮-১০টি উপজেলা নিয়ে একটি জেলা। স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসক/প্রতিনিধি উভয় স্তরেই রয়েছে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্থানীয় সংসদ সদস্যদের একক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যা নিয়ে উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। তার মধ্যে নতুন করে জেলা বাজেট বাস্তবায়ন নতুন করে সংঘতের জন্ম দেয় কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়। তবে জেলা বাজেটের সঙ্গে উন্নয়ন বরাদ্দ বাস্তবায়নের কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়, কারণ বাস্তবায়ন বিষয়টি ভিন্ন। জেলা বাজেট সার্বিক জেলার জন্য ব্যয়ের খাত (অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন) নির্ধারণ ও ব্যয় নির্বাহের জন্য আয়ের পথগুলো শনাক্তকরণ একটি প্রধান কাজ। প্রস্তাবিত জেলা বাজেটগুলোতে বরাদ্দের অংশ ব্যয় অনুন্নয়ন-উন্নয়ন উল্লেখ রয়েছে; কিন্তু আয় কোন খাত থেকে কত আসবে তার কোন উল্লেখ নেই। ফলে আয় দিয়ে ব্যয় মেটানো যাবে কিনা এবং ঘাটতির পরিমাণ কত হতে পারে এ নিয়ে সংশয় রয়েই গেল। কেন্দ্রীয় বাজেট যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সার্বিক অগ্রগতির তদারক করে, ঠিক একই ভাবে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের রাজস্ব ও উন্নয়ন বিভাগ সার্বিক কাজটির পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে পারে। তবে এই পরীক্ষামূলক জেলা বাজেটের ফলাফল কি হবে তার জন্য আমাদের আরো সময় দিতে হবে। উদ্যোগটি যে মহত্ এবং এর বাস্তবায়ন করাটাই যে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষত সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত করা। এ ব্যাপারে নেপালের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। লেখক : কৃষি অর্থ নীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন