ইসরাইল বিশ্বের সকল সভ্য মানুষের আবেদন আহ্বানকে তোয়াক্কা না করে প্যালেস্টাইনে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিহিংসার কারণে সারাবিশ্বের চোখের সামনে শত শত নিরীহ নাগরিকদের হত্যা, একের পর এক ঘরবাড়ি-হাসপাতাল ধ্বংস করে চলেছে তারা। মানবতার বিরুদ্ধে এতো বড় অপকর্মের প্রতিবিধান যদি না হয় তা বিশ্বের সকল সভ্য নাগরিকের জন্য দুর্ভাগ্যের। বিশ্বজুড়ে যারা গণহত্যা চালাচ্ছে তাদের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে, হে বিশ্ববাসী আপনারা আরো উচ্চকণ্ঠে কথা বলুন। নিশ্চয় আপনাদের উচ্চকণ্ঠের প্রতিবাদ আর ঘৃণায় অপরাধীরা নিষ্ক্রিয় হতে বাধ্য হবে। মাস কিলিং বলুন আর জেনোসাইড বলুন সবরকম নিষ্ঠুরতাকে ছাপিয়ে গেছে ইসরাইল। তা না হলে শিশুদেরকে টার্গেট করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানোর উদ্দেশ্য কী? প্যালেস্টাইন ভবিষ্যত্ প্রজন্মের অস্তিত্ব যাতে টিকে না থাকে, এইতো! নাকি শিশুদের রক্তের স্বাদ তাদের কাছে খুব প্রিয়। সুনির্দিষ্ট একটা জাতি বা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার উদ্দেশ্যেই ফিলিস্তিনিদের ওপর এই বর্বর হামলা। এছাড়া আরো এমন কিছু করা যাতে ঐ জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে ওঠে। যেমন- নির্মম হামলায় আহতদের চিকিত্সা নিতে দেয়া হচ্ছে না। হাসপাতাল ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছে। ওষুধ নিতে দেয়া হচ্ছে না। এ ধরনের সকল অপরাধই জেনোসাইড। সুদানের দারফুরে এমনভাবেই জেনোসাইড ঘটানো হয়। কাউকে হাতে মারা হয় না অথচ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় যাতে মানুষ না খেয়ে মারা যায়।
শান্তির পক্ষে দুনিয়ার সকল জনগণ হামাসের চরমপন্থা সমর্থন করে না, তাই বলে ইসরাইল সন্ত্রাসবাদ কায়েম করে ফিলিস্তিনে জঙ্গি নির্মূলের নামে সে দেশের সভ্যতাকে বিলীন করে দেয়ার কোনো অধিকার রাখে না। ফিলিস্তিনিরা ব্যাপক ছাড় দিয়ে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য দু’রাষ্ট্র প্রস্তাবনাকে তো মেনে নিতে মোটামুটি রাজি তবে ইসরাইলের আপত্তি কোথায়? মূলত ইসরাইল ফিলিস্তিনিদেরকে জাতিগতভাবে নিধন করে একরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতেই হায়েনার মতো এমন আক্রমণ এবং ফিলিস্তিনিদের জন্মভূমি একের পর এক দখলে নিয়ে অবৈধ বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। ফিলিস্তিন ইসরাইলের উপর আগ্রাসন চালানোর ক্ষমতা রাখে না, ইসরাইলের ভূমি জবরদখল করতেও যায়নি বরং নিজেদের জন্মভূমির মাটিকে অন্যের জবরদখল থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট তাঁরা। বিনিময়ে নিরীহ জনগণ অকাতরে জীবন হারাচ্ছে ইসরাইলের কামানের গোলায়, বোমা হামলায়।
বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ করে চলেছে ইসরাইল ও তার দোসররা। শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করছে তারা। দুনিয়ার যেখানেই শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ চলুক না কেন সারাবিশ্বের জনগণ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। সাদা চোখে দেখলে মনে হবে ফিলিস্তিন, সুদান, ইরাক বা অন্য দেশের মানুষের সাথে আমাদের আবার সম্পর্ক কিসের। কিন্তু পৃথিবীর যেখানেই এধরনের অপরাধ ঘটবে, সবই মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ। একটা জাতিকে বা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাসের জন্য কেউ যদি আক্রমণ করে, ধরে নিতে হবে এই আক্রমণ সারা দুনিয়ার মানুষের বিরুদ্ধে। এই অপরাধ পৃথিবীর বিরুদ্ধে।
গাজায় ইসরাইলের আক্রমণে অবাক হওয়ার কিছু নেই কিন্তু মেনে নেয়ারও জো নেই। নিরীহ নারী-পুরুষ আর নিষ্পাপ শিশুদের রক্ত নিয়ে হোলি আর কতকাল? ফিলিস্তিনকে পশ্চিমা বিশ্ব আর মধ্যপ্রাচ্যের দাবার বড়ে হয়ে চলার দিন শেষ হতে আর কত প্রাণ সংহারের প্রয়োজন পড়বে! এদিকে অপ্রতিরোধ্য ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কোনো আন্তর্জাতিক চাপ অনুভব করছেন না। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তিনি গাজায় হামলা বন্ধ করবেন না। ইসরাইলকে রুখতে হবে, না সামলাতে হবে এবিষয়ে কি আসলেই কোনো উত্তর জানা নেই কারো! ইসরাইল কী সারাবিশ্বের ৭০০ কোটি শান্তিকামী নিরপেক্ষ মানুষের চেয়েও শক্তিশালী হতে পেরেছে? অতীতে যখন হামাসের জন্মই হয়নি তখনও ইসরাইল ফিলিস্তিনিদেরকে সন্ত্রাসী বলত এবং সেই অজুহাতে ফিলিস্তিনে আক্রমণ চালাতো। আসলে ইসরাইলের এ আক্রমণ পরিকল্পিত। এই হামলা শুধুই উগ্রপন্থি হামাসের বিরুদ্ধে বা তাদের আত্মরক্ষার জন্য, সেরকম না। অন্যদিকে ইসরাইলের একজন মন্ত্রি হামাসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুঁড়েছেন, বলেছেন হামাস তাদের বেসামরিক লোকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অভিযোগটি হেলাফেলা করার মতো না। তবে প্রশ্ন থেকে যায় নির্বিচারে বিমান হামলার এই পরিস্থিতিতে মানবঢাল তৈরি কতটা যুক্তিযুক্ত।
লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যখন সঙ্কটের মুখে পড়ে তখন গাজায় অভিযান চালিয়ে সেই সরকার তাদের শক্তির মহড়া দেখায় সেইসাথে নিজদেশে জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করে, ফিলিস্তিনের নিরীহ নাগরিকদের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ চালিয়ে। ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইল যে আচরণ করছে তাতে এদের বর্ণবাদী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে গেছে। জাতিবিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বনিন্দা ধিক্কারের সম্মুখীন হতে আর কী বাকি আছে তাদের। জাতিবিদ্বেষী ইসরাইল যদি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় তাহলে ফিলিস্তিনিদেরও ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিতে হবে তাদের। যেভাবে নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তাতে হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়শিবির, উপাসনালয়ও বাদ যায়নি ইসরাইলের বর্বর বোমা হামলায়। ইসরাইল ফিলিস্তিনিদেরকে জাতিগতভাবে নিধনের সকল অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের নীতিই হচ্ছে যে কোনো অবস্থায় ফিলিস্তিনিদেরকে নির্যাতন নিষ্পেষণের মধ্যে রাখা, হোক সে নারী অথবা শিশু। অন্যের ভূখণ্ড জবরদখলে নিয়ে কী করে বৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কতটা জাতিবিদ্বেষী ও নির্মম হলে ফিলিস্তিনি নারীদের ধর্ষণের প্রকাশ্য ঘোষণা দেয় তারা। একের পর এক মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করে ইসরাইল বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে কিনা বিশ্বের সভ্য মানুষেরা ভেবে দেখুন। শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধের প্রতিকার চাওয়ার অধিকার পৃথিবীর সকল মানুষের রয়েছে।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোক্তা সদস্য
hasibhaque69¦yahoo.com
