ছিন্নমূল ও ভূমিহীনদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে গুচ্ছগ্রাম নামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সূচনা হয় আশির দশকের মাঝামাঝি। নদী ভাঙ্গন এবং ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মত প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগে উন্মূল হইয়া যাওয়া মানুষদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য খাস জমির উপর নির্মিত হয় গুচ্ছগ্রাম। একই ধরনের ছোট ছোট ঘর এবং সেইখানে আশ্রিতদের আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা করিতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সহায়তার এই কর্মসূচি তখন বেশ সাড়া ফেলিয়াছিল। জীবনের তাগিদে ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে যেন শহরমুখী না হইতে হয় সেইজন্য তত্কালীন সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রকল্প হাতে লইয়াছিল। তখন কিছুটা সুফলও পাওয়া গিয়াছিল। বহু ছিন্নমূল পরিবার এই কর্মসূচির সুযোগ গ্রহণ করিয়া তাহাদের ভাগ্য ফিরাইয়াছে। কর্মসূচির উদ্দেশ্য প্রায় একই ধরনের হইলেও বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন নামে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হইয়াছে। এখনও যে ইহার প্রয়োজন ফুরাইয়া গিয়াছে তাহা নহে। কিন্তু প্রকৃত বিচারে যাহারা ভূমিহীন ও হতদরিদ্র, শুধু তাহারাই যদি এই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করিতে পারে, আখেরে তাহা এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকেই সাধন করিবে যথাযথরূপে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপকারভোগী নির্বাচন করিতে অনিয়মের যেসব খবর পাওয়া যায় তাহা সত্যই হতাশাব্যঞ্জক। অভিযোগ আছে যে, পল্লী এলাকার আদৌ ভূমিহীন নহে এমন কোনো কোনো সমপন্ন ব্যক্তিও ভূমিহীন সাজিয়া এই সুবিধা গ্রহণ করিয়া থাকেন। ফলে প্রকৃতই যাহাদের মাথা গুঁজিবার ঠাঁই নাই তাহারা বঞ্চিত হয়। খুলনার পাইকগাছায় এইরকম ১৯টি প্রকল্পের প্রায় আশি শতাংশ ঘর কয়েক বত্সর ধরিয়া অব্যবহূত রহিয়াছে বলিয়া সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। ফলে অনেক ঘরের অবকাঠামো জরাজীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। বরাদ্দপ্রাপ্তরা কী কারণে ঘরগুলি ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গিয়াছে তাহা ঐ এলাকায় দায়িত্বরত ভূমি কর্মকর্তাও নাকি জানেন না। বোধ করি, যাহাদের নামে এসব আশ্রয়স্থল বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে তাহাদের আর্থিক সচ্ছলতা কিংবা বসবাস করিবার বিকল্প রহিয়াছে বলিয়া এমনটি হইয়াছে। অথচ পাইকগাছায় গৃহহীন, সহায়-সম্বলহীন মানুষের সংখ্যা এখনও নেহায়েত কম নহে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বরাদ্দ এবং বরাদ্দকৃত সমপদের রক্ষণাবেক্ষণে এমন অনিয়ম যে শুধু পাইকগাছায়ই হইতেছে তাহা নহে। দেশের অন্যত্রও পরিস্থিতি কমবেশি একইরকম। কাহারা এই সুবিধা গ্রহণ করিবে তাহা নূতন করিয়া নির্ধারণ করা জরুরি। বর্তমানে এইক্ষেত্রে কোনো নাগরিকের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমির মালিকানাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু এই ফাঁকে যে অনেকে সামর্থ্য থাকিতেও সরকার প্রদত্ত আশ্রয়ণের সুযোগ লইয়াছেন তাহার অনেক দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। ন্যূনতম পরিমাণ ভূমির মালিক নন কিংবা সামান্য একটুকরা জমিও নাই—এমন ব্যক্তির পক্ষেও আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া অস্বাভাবিক নহে। কাজেই কাহার কতটুকু অর্থনৈতিক সামর্থ্য রহিয়াছে, এইক্ষেত্রে তাহাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। দেশে বিদ্যমান ভূমিহীনদের জন্য নির্ধারিত আবাসন প্রকল্পে যাহাদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে তাহারা সেইখানে বসবাস না করিলে সেইগুলি চিহ্নিত করিয়া আশ্রয়হীনদের মধ্যে পুনঃবণ্টন করার উদ্যোগ লওয়া যাইতে পারে। সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে নির্মাণাধীন রহিয়াছে এমন আশ্রয়ণ প্রকল্পের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। নির্মাণাধীন এসব প্রকল্পের গৃহ বরাদ্দে যেন কোন অনিয়ম না হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হইবে। প্রকৃত ভূমিহীনরা যাহাতে সরকারি এই সুবিধা গ্রহণ করিতে পারে তাহা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়।
