যন্ত্রপাতি বিকল হইতে হইতে, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয় ও সম্পদ তসরুফের কবলে পড়িয়া লোকসান গুনিতে গুনিতে ছাতক সিমেন্ট কারখানা বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। উদাসীনতা এবং যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে ছাতক সিমেন্ট কারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্য অনেক কারখানার মতোই প্রথমত রুগ্ণ এবং অতঃপর অস্তিত্ব হারাইতে বসিয়াছে। অথচ সরকারি খাতের এই ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির আধুনিকায়নের জন্য একটি প্রকল্প-প্রস্তাব দীর্ঘ ৪ বত্সর ধরিয়া মন্ত্রণালয়ে আটকাইয়া রহিয়াছে। আর এই অবসরে, লোকসানের বোঝা কেবল ভারীই হইতেছে।
১৯৩৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকে ব্যক্তিমালিকানায় আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বিভিন্ন হাত ঘুরিয়া ১৯৮২ সাল হইতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণে ইহা পরিচালিত হইতেছে। ইহাই এই অঞ্চলের সবচাইতে প্রাচীন সিমেন্ট কারখানা। সর্বশেষ ২০০৩-২০০৪ অর্থবত্সরে কারখানাটিতে সর্বোচ্চ এক লাখ ৮০ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন সিমেন্ট উত্পাদিত হইয়াছিল। তাহার পর হইতেই পর্যায়ক্রমে উত্পাদনের মাত্রা কমিতেছে। গত তিন বত্সরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যাইতেছে, কোম্পানিটি মোট লোকসান দিয়াছে ৪৬ কোটি টাকার বেশি। ইহার মধ্যে ২০১১-১২ সালের লোকসান ১০ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১২-১৩ সালে ১৬ কোটি ৩১ লাখ ও ২০১৩-১৪ সালে (জুন পর্যন্ত) ১৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকার বেশি। পুরাতন যন্ত্রপাতি মেরামত, অপচয় এবং দুর্নীতিই ইহার কারণ। অথচ বাস্তব কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিলে ছাতক সিমেন্ট কারখানা আবারও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিকল্পিত উপায়ে ৮৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানার যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করিলে ছাতক সিমেন্ট কারখানা হইতে সরকার বত্সরে কমপক্ষে ৭৬ কোটি টাকা আয় করিতে সক্ষম হইবে। তদুপরি, কারখানার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় দশ হাজার লোকের কর্মসংস্থানও হইবে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ বলিতেছেন। ইহা ছাড়াও দেশে একমাত্র ছাতক সিমেন্ট কারখানাই সিমেন্ট ক্লিংকার প্রস্তুত করে। অন্য কারখানাগুলি বিদেশ হইতে ক্লিংকার আনিয়া সিমেন্ট তৈরি করে। ছাতক সিমেন্ট কারখানার আধুনিকায়ন হইলে সেখানে উত্পাদিত ক্লিংকার দেশের সকল সিমেন্ট কারখানার চাহিদা মিটাইবার সক্ষমতা অর্জন করিবে। ফলে তাহাদেরকেও বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিদেশ হইতে আর ক্লিংকার আমদানি করিতে হইবে না।
যন্ত্রপাতি মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময়ের পরে পুরাতন যন্ত্র পরিবর্তনের ব্যয় একটি শিল্পের উত্পাদন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ- উত্পাদন ব্যয়ের মধ্যেই তাহার হিসাব ধরা থাকে। কিন্তু অদক্ষ পরিচালনা, অবহেলা, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির কারণে উত্পাদন ব্যয়ের ভারে একটি কারখানা রুগ্ণ হইয়া উঠিতে পারে। ছাতক সিমেন্ট কারখানার বেলায়ও তাহাই ঘটিয়াছে। মালিকানার বদল হইয়া একটি কারখানা সরকারি পরিচালনা হইতে ব্যক্তিমালিকানায় চলিয়া যাইবে বা যাইতে পারে তাহাতে আমরা আপত্তি করি না। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলি নিয়মিত লোকসান দিতে থাকিবে, তাহা কিছুতেই কাম্য হইতে পারে না। পেপার মিলগুলি, চিনির কলগুলি, সার কারখানাগুলি, পাটকলগুলি একইভাবে নিয়মিত লোকসান দিতেছে, উত্পাদন বন্ধ রাখিতেছে কিংবা বন্ধ হইয়া যাইতেছে। অথচ এই কারখানাগুলিই একসময় অত্যন্ত লাভজনক ছিল, বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার আশ্রয় ছিল। ইহা একটি দেশের শিল্প প্রসারের পথে ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতার চিত্রই তুলিয়া ধরে। আমরা আশা করিব, কর্তৃপক্ষ কারখানাটির আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি, তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকিয়া থাকিবার উপযুক্ত গতিশীল ও নিষ্ঠাবান ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করিবেন; যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে রুগ্ণ কারখানাগুলিকে লাভজনক করিয়া তুলিতে আধুনিকায়ন ও দক্ষ শ্রমব্যবস্থাপনার নীতি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
