মহাজাগতিক

উল্কা রহস্য ও আগস্টের উল্কাবৃষ্টি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৪, ২০:৫১
মনের ভেতরে উল্কা কীভাবে আতঙ্কের কাঁপুনি ধরাতে পারে গত বছর রাশিয়ার মানুষ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। গুগল অনুসন্ধানে গতকাল আমরা আবিষ্কার করলাম ‘পার্সেড উল্কাবৃষ্টি’ আসছে। চলবে আগামী কয়েক দিন। সেটা কী জিনিস, বুঝতে যেখানে যেখানে খোঁজ অর্থাত্ দ্য সার্চ চালানো হলো, তাতে অবস্থা হযবরল। সেখান থেকেই বেছে বেছে বুঝে বুঝে যা পাওয়া গেল তাতে চমকাতে হলো, থমকাতেও হলো। ছোটবেলার ‘তারা-খসা’ কে না দেখেছি! আকাশের বিশাল চাদরে কোটি কোটি তারা। তারাই যেন দুই-একটা শখ করে নেমে আছে পৃথিবীর কোলে। পৃথিবী থেকে যে এক একটা সত্যিকারের তারার দূরত্ব কত সহস্র কোটি কিলোমিটার, তার হিসেব তখন কে রাখত? ওই ক্ষুদ্র মিটিমিটি তারাকেই মনে হতো খসে পড়ছে পৃথিবীর জমিনে। ওগুলো যে অতি সামান্য মহাজাগতিক ভাসমান বস্তু, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়লে বাতাসের ঘর্ষণে পুড়তে শুরু করে, দেখে মনে হয় যেন জ্বলন্ত তারা। এখন তার পরিচয় ‘উল্কা’ নামে। কিন্তু ‘পার্সেড উল্কাবৃষ্টি’ জিনিসটা কী? বছরে দুইটি উল্লেখযোগ্য উল্কাবৃষ্টির অন্যতম পারসেইড উল্কাবৃষ্টি। বাংলাদেশের আকাশে ১২ আগস্ট বুধবার এবং ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাত ১টা থেকে পারসেইড উল্কাবৃষ্টি দেখা যাবে। এছাড়া আগামী ২২ আগস্ট শেষ রাতে এ উল্কাবৃষ্টি কমবেশি লক্ষ্য করা যাবে পারসিয়াস তারামণ্ডলের একটু ওপরে। এবারের পারসেইড উল্কাবৃষ্টি অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, সুইফট-টাটল নামের একটি ধূমকেতুর লেজের অংশের ধূলিকণা এ সময় পৃথিবীর কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে। বুধবার রাত ১২টা থেকে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব আকাশে ক্যাসিওপিয়া তারামণ্ডলের একটু ডানে পারসিয়াস তারামণ্ডলের ইটা-পারসি তারাটির পাশের অঞ্চল থেকে শুরু হবে এ উল্কাবৃষ্টি। আকাশে উক্ত অঞ্চলকে পারসেইড রেডিয়েন্ট বলা হয়। এ সময় প্রতি ঘণ্টায় আকাশের ঐ অঞ্চলে প্রচুর উজ্জ্বল উল্কার ঝাঁক আলোক বিন্দুর মতো দেখা যাবে। বলা যায়, উল্কা নিয়ে আঁকা হবে আকাশের গায়ে উল্কি। মধ্যরাতের পর আকাশের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে দৃষ্টি রাখলেই মহাজাগতিক এ ঘটনাটি দেখা যাবে খালি চোখেই। এবার আরো স্পষ্ট করে বোঝা যাক উল্কা কী জিনিস। কোনো মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর যথেষ্ট কাছে এসে পড়লে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানে এটি ভূপৃষ্ঠের দিকে তীব্র বেগে এগোতে থাকে। আর এসময় এটি বায়ুমণ্ডলের সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। তখন যে ক্ষণস্থায়ী সরু আলোর রেখা দেখা যায়, তা-ই উল্কা। বেশিরভাগ সময়ই উল্কার আকার এত ছোট হয় যে, এটি আসার পথেই জ্বলে ছাই হয়ে যায়। যদি এটি মোটামুটি বড় আকারের হয় তবে এর যে অবশিষ্টাংশ ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে তা হল উল্কাপিণ্ড। গত বছর রাশিয়ায় বেশ বড় একটি উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়েছিল। শত শত জানালার কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আহত হয়েছিল প্রায় চার শ মানুষ। কথা হলো, কোন মহাজাগতিক বস্তু আসে এমনভাবে? পৃথিবীর চারপাশে শুক্র বা মঙ্গলের আগে পর্যন্ত তো তেমন কিছুই নেই, তাহলে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে প্রতি ঘণ্টায়ই যে গড়ে ৫টি উল্কাপাত দেখা যায়, তার উত্পত্তি কোথায়? উত্তর হলো—অনেক জায়গাতেই! আসল কথা হলো, সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট পরিচিত সদস্য গ্রহাণুগুলোও পৃথিবীর বেশ দূরে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে; কিন্তু এগুলো ছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট কণা বা পাথরের টুকরোর মতো পদার্থ ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। আর মোটামুটি সিংহভাগ উল্কাই এসব কণার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জ্বলে ওঠার দৃশ্য। তাই এদের কেউই পৃথিবী পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। প্রতি ১০০ বছরে হয়ত মাত্র কয়েকটি ছোট খাটো টুকরো পৃথিবী পর্যন্ত এসে পৌঁছে। আর এখানে এসে বিশালাকার খাদ কিংবা ডাইনোসরদের বিলুপ্ত করে দেবার মতো ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী উল্কা আসার সম্ভাবনা মোটামুটি প্রতি তিন লাখ বছরে একবার মাত্র। এগুলো হলো মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মাঝামাঝি গ্রহাণুপুঞ্জের কোনো বিক্ষিপ্ত সদস্যের কাজ, যেটি ঘুরতে ঘুরতে মঙ্গল ও পরে পৃথিবীর আকর্ষণে পথ বদলাতে গিয়ে শেষমেশ পৃথিবীর মহাকর্ষ বল এড়াতে পারে না। অবশেষে কয়েকশ পারমাণবিক বোমার শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে। সাধারণত, ভোরের দিকে সন্ধ্যার চেয়ে বেশি উল্কা দেখা যায়। কারণ, সেসময় পৃথিবীর গতির দিকেই উল্কাদের অবস্থান হয়। খালি চোখে আমরা যেসব উল্কা দেখি সেগুলো প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উপরে থাকে আর এদের বেগ থাকে প্রায় প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার। মজার ব্যাপার হলো- প্রতি বছরই কিছু নির্দিষ্ট দিনে আকাশে উল্কার পরিমাণ বেশ বেড়ে যায় (প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০/৪০টি)। একেই বলে উল্কাবৃষ্টি। আর এই অসংখ্য উল্কা আকাশের একেকটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই আসে। এই জায়গাগুলিকে বলে বিকিরণ বিন্দু বা রেডিয়েন্ট। এ থেকে মনে আসতেই পারে যে, এগুলোর নিশ্চয়ই একটি মাতৃ অংশ আছে। সূর্যের কাছে যে সকল ধূমকেতু আসে সেগুলোর বিশাল আর সুবিস্তৃত বরফকণাপূর্ণ গ্যাসীয় লেজের যেসব অবশিষ্টাংশ এদের কক্ষপথের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকে, পৃথিবী তার চলার পথে এদের কাছে চলে আসলে মোটামুটি কাছাকাছি অঞ্চল থেকে এরা উল্কা হয়ে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। এভাবে একেকটি ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণার দঙ্গল থেকেই বেশিরভাগ উল্কাবৃষ্টি হয় বলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে একেকটি উল্কাবৃষ্টি হয়। আর এই নির্দিষ্ট বিন্দুগুলো মূলত আকাশের পটভূমিতে একেকটি তারামণ্ডলের মধ্যে থাকে। তাই অবস্থান শনাক্তকরণ সহজ করতে একেকটি উল্কাবৃষ্টি যে তারামণ্ডলের পটভূমিতে হয়—তার নামকরণ সেই তারামণ্ডলের নামানুসারে হয়। অনেক সময় মণ্ডলের নামের শেষের দুই-একটা বর্ণ বাদ দিয়েও শেষাংশ যোগ করা হয়। যেমন গত বছরের মতো এবারও আগস্টে যে উল্কাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে তার নাম ‘পার্সেড উল্কাবৃষ্টি’ যেটির নামকরণ হয়েছে পারসিয়াস তারামণ্ডল থেকে। আর এটি হয় ‘সুইফট টাটল’ নামের একটি ধূমকেতুর অবশিষ্টাংশ থেকে। এসব উল্কাবৃষ্টি দৃষ্টিনন্দন হলেও উল্কাও হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর প্রলয়ের কারণ। গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি মধ্য রাশিয়ার উরালের চেলিয়াবিনস্কে তিন ঘণ্টার টানা উল্কাপাত নিয়েই চিন্তা বেঁধেছে আন্তর্জাতিক মহলে। সে কারণে গত বছর উল্কাপাত আর গ্রহাণু আক্রমণের মতো মহাজাগতিক আক্রমণ এড়াতে আন্তর্দেশীয় নেটওয়ার্ক গড়তে উদ্যোগী হয়েছে জাতিসংঘ। কারণ গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল পৃথিবী। মাত্র ২৮ হাজার কিলোমিটারের দূর থেকে চলে গিয়েছিল ‘২০১২ডিএ১৪’ নামের একটি গ্রহাণু। সাত হাজার টন ওজনের গ্রহাণুটি পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও ২০৪৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আর একটি বিপুলকার গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার গোল্ডস্টোন ডিপ স্পেস সেন্টার এই কথা বছর শুরুর আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। আর ১৪৮ ফুট ব্যাসের ১ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টনের ঐ পাথুরে গ্রহাণু যদি পৃথিবীকে ধাক্কা মারে তা একনাগাড়ে ১০টি পারমাণবিক বিস্ফোরণের সমান ক্ষতি করবে। সেই সঙ্গে পৃথিবীকে প্রায় ঢেকে থাকা কৃত্রিম উপ-গ্রহগুলোর বেশিরভাগই ছাই হয়ে যাবে। তবে ‘পার্সেড উল্কাবৃষ্টি’ উল্কাবৃষ্টি শুধু দৃষ্টিনন্দনের আনন্দ দেবে। সেই দৃশ্য উপভোগ করলে মনের ব্যাপ্তিও প্রসারিত হয়। লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন