‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৫
একটি আশ্রয়হীন বিড়ালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জেমস বোমার দান করিয়াছেন মাত্র দেড় লক্ষাধিক মার্কিন ডলার! বাক্যের শেষে বিস্ময়চিহ্ন দেওয়া কি ঠিক হইল? পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার এ ধরনের নজিরের কি অভাব আছে? নিউইয়র্কের ধনী হোটেল ব্যবসায়ী মিসেস লিওনা হেলমসলি ২০০৭ সালে মৃত্যুর পূর্বে তাহার ছোট্ট আদুরে মলটিজ কুকুরের জন্য ১ কোটি ২০ লক্ষ ডলার উইল করিয়া যান। কিছুদিন পূর্বে ওয়াশিংটন পোস্টে একটি খবর প্রকাশ হইয়াছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ গত বত্সর তাহাদের পোষা প্রাণীর জন্য ব্যয় নির্বাহ করিয়াছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থের সিংহভাগই ব্যয় হইয়াছে পোষা কুকুর ও বিড়ালের জন্য। প্রিয় পোষা প্রাণীর খাবার, প্রশিক্ষণ, চিকিত্সা, সাবান, শ্যাম্পুসহ বিবিধ সরঞ্জাম ক্রয়ের পেছনে এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। কেবল কুকুর-বিড়ালকে সভ্যভব্য’র প্রশিক্ষণ প্রদান করিতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দারা বত্সরভর ব্যয় করেন ৬১০ কোটি ডলার। না, এইখানেও বিস্ময়বোধক চিহ্ন চলিবে না। তাহা বোধকরি অজ্ঞতার পরিচায়ক হইবে। কুকুর আর তাহার মনিবের ভালোবাসার ‘বাড়াবাড়ি’র খবর আমরা নানা সময় পড়িতে পড়িতে এখন আর বিস্মিত হই না। রাবেকা নামের এক মনিব দুই বত্সর পর তাহার পোষা কুকুরটির কাছে ফিরিয়া আসিলে রাবেকাকে দেখিয়া কুকুরটি এমনই আত্মহারা হইয়া পড়ে, এমনই আবেগময় আচরণ করে—যাহার ভিডিও ফুটেজ ইউটিউবে আপলোড করিবার পর মাত্র কয়েক দিনেই দেড় কোটি ভিউ ছাড়াইয়া যায়। উন্নত বিশ্বে মানুষের আগ্রহের জায়গাটায় কুকুর কোথায় রহিয়াছে, ইহা তাহারও উদাহরণ। কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর একটি ছোট্ট শহর ডিভাইডের মেয়র নির্বাচিত হয় একটি কুকুর। সেইখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়াছে আরও ছয়টি কুকুর, একটি গাধা, একটি বিড়াল এবং একটি সজারু। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা প্রায় ৩২ কোটি, আর পোষা কুকুর বিড়াল রহিয়াছে প্রায় ১৮ কোটি। তাহাছাড়া পোষা পাখি, ঘোড়া, মিঠাপানির মাছ, লোনাপানির মাছ, সরীসৃপ ও ছোট প্রাণী রহিয়াছে আরও প্রায় ২২ কোটির কাছাকাছি। বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত উদ্ধৃতি আছে—‘জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ জীবপ্রেম মানবতার অংশ নিশ্চয়ই। তাহা লইয়া কোনো প্রশ্ন নাই। তবে মানুষ সম্ভবত একমাত্র ‘উন্নত’ প্রাণী যাহারা নিজের ‘আত্মসুখ’কেই শেষ কথা বলিয়া মনে করে। সেই আত্মসুখময় জীবনে যদি পোষ্যপ্রাণীরা খুব চমত্কারভাবে আনন্দের জোগান দিতে পারে তবে ‘জীবপ্রেম’ বাইপ্রডাক্ট হিসাবে প্রকাশ পায় বটে। সারা বিশ্বে কত কোটি মানবশিশু না খাইয়া রাত্রে ঘুমাইতে গেল, সেই প্রশ্ন এইখানে উত্থাপন করা উচিত হইবে না। মানুষ বাঁচে নিজের জন্য, আত্ম-আনন্দের জন্য। সেইখানে যদি পোষ্যপ্রাণী আত্ম-আনন্দের উত্স হয়, তবে তাহাই শিরোধার্য, অন্যকিছু নহে। ‘আর্ত শিশু’র জন্য কিছু করা, কিংবা দীনে দয়া দেখানো—তাহাও করা যাইতে পারে অভিরুচি ও আপন খেয়াল অনুযায়ী। ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ উত্সারিত হইবে ‘আমার’ আনন্দের জন্য—ইহাই জগতের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন