এক একটি দুর্ঘটনা মানেই এক একটি কষ্টের, বেদনার নীল গল্প। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সব গল্প। ঈদ আনন্দের রেশ না কাটতেই মাওয়ার লঞ্চ দুর্ঘটনার পর কয়েকশ’ পরিবার সেই কষ্ট, বেদনা, দুঃখের গল্পে নতুন করে বন্দী হয়েছেন। কেউ যেমন হারিয়েছে ভাইকে, কেউ তেমনি বোন, স্ত্রী-সন্তানকে। আবার কারো পরিবার থেকে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ একই সাথে হারিয়ে গেছে সাত-আটজন। আবার ভাগ্যের জোরে বা অলৌকিকভাবে যারা বেঁচে এসেছেন তাঁদের বেঁচে থাকাটাও যেনো আরও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরিদপুর জেলার সালথা উপজেলার উচ্ছল তরুণ সৈয়দ মুহম্মদ সাদী লঞ্চ দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রী শেফালী, ছেলে আরাফ এবং আয়ানকে। ঐ লঞ্চে তিনিও ছিলেন। স্ত্রী-সন্তানদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন শেষঅব্দি। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় নিজ হাতে দু’সন্তানকে বুকের মধ্যে ধরে রেখেছিলেন। স্ত্রীকে বলেছিলেন তার প্যান্ট আঁকড়ে ধরে রাখতে। সাদি নিজে বাঁচলেও বাঁচাতে পারেননি স্ত্রী শেফালি এবং সবচেয়ে প্রিয় দু’সন্তান আরাফ এবং আয়ানকে। মৃত্যুর হাত থেকে তিনি রেহাই পেলেও শূন্য হাতে তিনি ফিরে এসেছেন নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে। একইভাবে গোপালগঞ্জ জেলা মুকসুদপুরের সিরাজ খোন্দকার নিজে বাঁচলেও বাঁচাতে পারেননি শিশুকন্যা মেঘলা এবং স্ত্রী পলিকে। বড়দিয়া গ্রামের উদুলের ভাগ্যেও ঘটেছে একই ঘটনা। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে সবাইকে হারিয়েছেন তিনি। স্বয়ং নৌমন্ত্রীর তিন উচ্ছল ভাগ্নি স্বর্ণা, হারী, লাকি— তিনজনেরই সলিল সমাধি হয়েছে। শুধু পাওয়া গেছে একজনের লাশ। সদরপুর উপজেলার সাতরশি গ্রামের একই পরিবারের ১১ জনের মধ্যে হারিয়ে গেছে ৭ জন। শিবচরের দুঃখী সুরাতুন্নেসার ছেলে, মেয়ে, জামাতা, নাতি কেউ ফিরে আসতে পারেনি পদ্মার জলভেঙে। এরকম আরও অনেক পরিবারের গল্পই এরকম। স্বজন হারানো মানুষগুলো এখন আর কাঁদতেও পারছে না, চোখে তাঁদের যতটুক জল ছিল তার সবটুকুই যেনো নিঃশেষ হয়ে গেছে।
কেন এই দুর্ঘটনা? কেন এই জীবনহানি? কেন এত শোক-এত কান্না? ৪ আগস্ট মাওয়ায় পদ্মায় লঞ্চ চলাচল করছিল আগের মতোই। এমএল পিনাক-৬ লঞ্চ যাত্রী বোঝাই করে ওপার থেকে মাওয়ায় আসছিল। স্বভাবতই ঈদ উপভোগ শেষে যাত্রীরা ছিল ঢাকামুখী। ঈদ শেষে সবাই বাসা এবং কর্মস্থলে ফিরে আসার তাগাদা নিয়েই আসছিলেন। কিন্তু মাওয়া ঘাটের কাছাকাছি আসতেই ঘটে দুর্ঘটনা। হঠাত্ করে ঢেউ-এর তোড়ে লঞ্চের ভেতরে পানি উঠে পড়ে। এরপর লঞ্চ কাত হয়ে আস্তে আস্তে ডুবে যায়। তবে এই ঘটনার পর আমরা উপচে পড়া মানবিকতাও দেখেছি। লঞ্চ দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পরই স্পীডবোট চালকেরা স্ব-উদ্যোগেই পানির সাথে জীবনযুদ্ধরত মানুষ উদ্ধারে নেমে পড়েন। সেই রানা প্লাজার ঘটনার মতো মানুষকে বাঁচানোর তাগিদে স্থানীয় স্পীড চালকেরা দ্রুতগতিতে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত অনেককেই উদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিন্তু পদ্মার বুক চিরে ওঠা উত্তাল ঢেউ অনেক আগেই কয়েকশ’ মানুষকে চোখের সীমানার বাইরে নিয়ে চলে যায়। আর সময় যত দ্রুতগতিতে গড়াতে থাকে ততই মানুষগুলোও সে াতের টানে চলে যায় একেবারে দূর থেকে আরও দূরান্তে।
পিনাক লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয় লঞ্চটির ফিটনেসের অভাব এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন। জানা যায়, আন্তর্জাতিক আইন মেনে লঞ্চ নির্মাণ করলে লঞ্চ ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত কাত হলেও তাতে পানি ওঠার কথা নয়, কিন্তু আমাদের দেশের লঞ্চগুলো ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি কাত হয়ে গেলেই পানি উঠে যায়। অর্থাত্ দেশের বেশিরভাগ লঞ্চই নির্মিত হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ নকশায়। অথচ এই ভুল নকশা যারা প্রণয়ন, অনুমোদন করেন এবং যারা এই নকশা অনুসরণ করে অথবা ভুল নকশায় লঞ্চ নির্মাণ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোনও আইন নেই। লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলে মালিক, চালক, জরিপকারীসহ অনেকের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থার কথা থাকলেও নকশাকারী বা নির্মাণকারী সম্বন্ধে কিছু নেই এ সংক্রান্ত ১৯৭৬ সালের আইনে। আমরা মনে করি, এদেরকেও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
বহু আগে থেকেই দেশের পরিবহন খাতে সবসময়ই নৌপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিবেচিত। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট যাত্রী সংখ্যার শতকরা ৩৫ ভাগ নৌপথে চলাচল করে। মালামালের ৭০ শতাংশ এবং তেলজাত দ্রব্যের ৯০ শতাংশ এই পথে পরিবহন করা হয়ে থাকে। অন্য একটি হিসাব থেকে জানা যায়, প্রতিবছর প্রায় ৯ কোটি মানুষ দেশের নৌপথে যাতায়াত করে। নানা যৌক্তিক কারণেই নৌপথ দেশের জনপ্রিয়, সহজলভ্য এবং আরামদায়ক ভ্রমণ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। ঈদ, পূজাপার্বন, বর্ষায় নৌপথে চলাচলের হার আরও বেশি বেড়ে যায়। অথচ এই নৌপথ প্রাণহানি ও শোকের অন্যতম এক উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই দেশের কোনো কোনো নৌপথে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তা প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে যতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা ছিল তা রাখা হচ্ছে না। বরং দাফন-কাফনের অনুদান দিয়েই সরকার যেনো সব দায় মোচন করছে। বিবিধ কারণেই নৌপথগুলো মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম একটি কারণ সমন্বয়হীনতা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সমুদ্র অধিদপ্তর, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ—কারো সাথে কারোর কাজের সমন্বয় নেই। অনেক বিষয়েই তাদের মধ্যে চরম নৈকট্যের অভাব। আবার কখনও কখনও বড় বড় উদ্যোগ বা তদারকির কথা বলা হলেও তা ফাইলেই পড়ে থাকছে। সবশেষে যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছে নৌ-দুর্ঘটনা। বাড়ছে স্বজনহারা মানুষের ক্রন্দন। স্বভাবতই চরম অব্যবস্থাপনা, অসতর্কতা, রাজনীতিকরণ আর নদীর নিষ্ঠুরতায় সহজ সরল সুরাতুন্নেসাদের জীবনে অনন্তকালের জন্যে শোক চেপে বসছে। যে শোক তাঁদের ছোট্ট জীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে সুরাতুন্নেসারা নৌ-দুর্ঘটনার নির্মম শিকার হলেও দুর্ঘটনা রোধের কার্যকর পরিকল্পনাটা চোখে পড়ে না। আসলেই রাষ্ট্রযন্ত্র এক অদ্ভুত ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। কবে ভাঙবে সেই ঘুম? কবে নিশ্চিত হবে যাত্রীস্বার্থ?
লেখক: চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
[email protected]
