শ্রা বণ মাস শেষ হতে চললেও দেশে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। কয়েকদিন ধরে আকাশে মেঘের ব্যাপক আনাগোনা থাকলেও বৃষ্টি হচ্ছে সৃষ্টি ছাড়ার মত। অনেক প্রত্যাশার পর একটু পথ ভেজানো বৃষ্টি! এ নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। জমি থেকে তারা পাট কাটতে পারছেন না। ধানের চারা রোপণের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ডিজেল খরচ করে স্যালো মেশিন চালিয়ে জমিতে পানি দিয়ে রোপণের কাজ কেউ কেউ শেষ করলেও অনেকে এখনও তা করতে চাচ্ছেন না। ওদিকে পানির অভাবে অনেক জায়গায় মরে যাচ্ছে সদ্য লাগানো রোপা আমন চারা। বাড়তি সেচ দিতে হিমশিম খাচ্ছে কৃষক। ফলে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। প্রবীণ চাষীরা বলছেন, এমন অবস্থা তারা বহু যুগ দেখেনি। আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে এমনটা ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করছেন। এদিকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, লঞ্চডুবিতে মৃত্যু, সন্ত্রাসী-অপরাধীদের হাতে মৃত্যু ইত্যাদি নানাভাবে মানুষের মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। প্রতিকারহীন এই ‘মৃত্যুপুরী’তে আলাপ-বিলাপ-প্রলাপ সবই চলছে। কিন্তু সমস্যা থেকে উত্তরণের কোন কার্যকর পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অনেক প্রত্যাশার নতুন ধারার রাজনীতির দেখা মিলছে না। নেতানেত্রীদের বক্তৃতায়, টিভি টকশোর আলোচনায় কেবল বয়ে চলেছে কথার ফল্গুধারা। আমাদের দেশে অবশ্য ধারা আছে, কিন্তু নেই ধারাবাহিকতা। তারপরও ধারা থেমে নেই। শিশুশিক্ষার ধারাপাত পেরিয়ে মাধ্যমিকের বাগধারা অতিক্রম করে অঝোর ধারা, গতিধারা, মূলধারা, অন্য ধারা, পরাজয়ের ধারা, উত্তেজনার ধারা, বিকল্প ধারা, করুণা ধারার মত অজস্র ধারায় আমাদের পথ চলা অব্যাহত রয়েছে। যদিও আইনের ধারা বিপথে, ১৪৪ ধারা, ৫৪ ধারা ঝর্ণাধারার মত বইছে। এদিকে শ্রাবণেও দেখা নেই বৃষ্টিধারা। মুক্তধারার মত সব ভেঙ্গেচুরে বাইরে আসার ডাক নেই, আছে পারস্পরিক আক্রমণের ধারা, শিক্ষা, বিশেষত উচিত শিক্ষা দেয়ার ধারা!
গণতান্ত্রিক ধারা মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম, উন্নয়নের ধারা পথহারা। জাতীয় রাজনীতিতে স্পষ্ট বিভেদের দুই ধারা। ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারহীন দেশ। এমন বৈরী পরিস্থিতিতে কে বদলাবে জীবনধারা? কে ধরবে হাল? কে তুলবে পাল? আমরা সমস্বরে রবিঠাকুরের ভাষায় গাইতে পারছি না—আমার সকল রসের ধারা, তোমাতে আজ হোক-না হারা! বৃষ্টিধারাহীন আকাশ যেমন গর্জনের ধারা অব্যাহত রেখেছে, ঠিক তেমনি কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ বিএনপিও কথার ফল্গুধারা অব্যাহত রেখেছে। দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সরকার পতনের হুংকার দিয়ে আসছে বিএনপি। তবে রমজান মাসে তাদের এই হুংকারের মাত্রা ছিল লক্ষণীয়, যেখানে ছিল ঈদের পর জোরেসোরে আন্দোলনে নামার হুমকি। তাতে বাধা এলে এর পরিণতির বিষয়েও সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি ছিল দলের সর্বোচ্চ নীতি- নির্ধারণী ফোরামসহ সব সারির নেতাদের মুখে।
ঈদ-পরবর্তী আন্দোলনের জন্য বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে যে মাত্রার হুমকি শোনা গেছে, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। তার প্রস্তুতিও দেখা যাচ্ছে না। অনেক তর্জন-গর্জনের পর বিএনপির নেতৃত্বা-ধীন ২০ দলীয় জোট গত মঙ্গলবার মিছিল-সমাবেশসহ নতুন কর্মসূচি দিয়েছে। তবে নতুন নির্বাচনের দাবিতে নয়, সমপ্রচার নীতিমালা এবং গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে। বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কটের পর এই ‘কানা-সোনার’ জোট প্রথমবারের মতো ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দিলো। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছ হতে পবিত্র রমজান মাসেই ঘোষণা এসেছিল ঈদের পর কঠোর আন্দোলন কর্ম-সূচির। ঈদ শেষ হয়ে যাওয়ার দু’সপ্তাহ পরে রুটিনভিত্তিক এই কর্মসূচি ঘোষণা অনেকটাই পর্বতের মূষিক প্রসব! এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ঢাকায় সমাবেশ, সারা দেশে বিক্ষোভ ও গণসংযোগ। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নেতারা বলেছেন, ‘শান্তিপূর্ণ নরম কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি কঠোর হবে।’
৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে না পেরে বিএনপি এবং এর জোটের শরীকদের মাঠপর্যায়ে হতাশা দেখা দিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় প্রথম পর্যায়ে বিএনপি সংগঠন পুনর্গঠনের কাজ হাতে নিয়েছিল। কিন্তু সংগঠন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া খুব একটা সফল হয়নি বলেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে। দল পুনর্গঠন নিয়েও মোটে স্বস্তিতে নেই বিএনপি। ঘোষণার একমাসে ঢাকা মহানগর কমিটি দৃশ্যমান কিছু করতে না পারলেও উল্টো কয়েকদফা বিশৃঙ্খলা, ব্লেইম-গেইম, পরস্পরকে মেনে নিতে না পারার বিষয়টি জনসম্মুখে এসেছে। বিএনপি নেতাদের গরম গরম কথার বিপরীতে নরম কর্মসূচি নিয়ে অনেকে হাসি-ঠাট্টাও করছেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি পুরনো গল্প। এক লোকের স্বভাবই ছিল কথা দিয়ে সব কিছু ম্যানেজ করা, মুখে উজির-নাজির মারা। একদিন সে বন্ধুদের বলল, মেলা থেকে একটা ঘোড়া কিনে এনেছি সেটা ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে চলতে পারে। একটা মোরগ কিনেছি যেটা ঘড়ির কাজ করে। প্রতি একঘণ্টা পর পর ডাকে। আর একটি লেখাপড়া জানা কুকুর কিনেছি। ছোট ছেলেটার লেখাপড়া এখন সেই সামলায়। বন্ধুরা তার অনেক গালগল্প সহ্য করেছে, কিন্তু আজকেরটা আর পারল না। তারা বলল, আমরা দল বেঁধে তোমার ওইসব বিচিত্র জন্তু-জানোয়ার দেখতে যাব কাল বিকেলে।
ধাপ্পাবাজ ওই লোক চিন্তিত হয়ে পড়ল। বাড়ি ফিরে বউকে সবকিছু খুলে বলল। বন্ধুরা কাল এলে এইবার বুঝি সব প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যায়! ধাপ্পাবাজের বউ যেন আরেক কাঠি সরেস। সে স্বামীকে অভয় দিয়ে বলল, আসুক না তারা, তুমি কাল বিকেলে ঘরে লুকিয়ে থেকো। আমিই সব ম্যানেজ করে নেব।
বন্ধুরা পরদিন আসতেই বউ বলল, উনি চট্টগ্রাম গেছেন। আগামীকালই ফিরে আসবেন। ঘোড়ায় চড়ে গেছেন তো।
সে কি! ঘোড়ায় চড়ে গেছেন কেন?
আমাদের ঘোড়াটি ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে চলে। পোষা ঘোড়ায় এক্সিডেন্টের ভয়ও কম। দূষণের হাত থেকেও বাঁচা যায়। এ অবস্থায় গাড়ির চাইতে ঘোড়াই ঢের ভালো। এমন সময় একটা মোরগকে ছুটে যেতে দেখা গেল।
এটা কি ঘন্টায় একবার ডাকে? আমরা কিন্তু ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করব। বউ বলল, ঘণ্টায় একবার করে এটা ডাকে বটে, কিন্তু বাইরের লোক এলে এটা লজ্জা পায়। তখন ডাকে তো নাই-ই, বরং একেবারে বোবা হয়ে যায়!
এরপর বন্ধুরা প্রশ্ন করে, আপনাদের সেই লেখাপড়া জানা কুকুরটা কোথায়? অন্তত তাকে একটু দেখে যাই। বউ বলল, ওতো বাড়িতে নেই। এখন আমাদের একটু টানাটানি চলছে কিনা। তাই সে টিউশনিতে অর্থাত্ ছেলে পড়াতে গেছে।
প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কতদিন?
লেখক :কলামিস্ট
