ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ ও নিয়ন্ত্রণ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪০
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও আতংকিত একটি ভাইরাসের নাম হচ্ছে ইবোলা। এই আতংক এখন সারা পৃথিবীব্যাপী। আতঙ্কের মূল কারণটি এখন আর আমাদের অজানাও নয়। এই ভাইরাসটির সংক্রমণে ইতিমধ্যেই ওয়েস্ট আফ্রিকার ১০১৩ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আক্রান্ত হয়েছে আরো অনেক বেশি (সাসপেকটেড কেস ১৮৪৮ জন)। কীভাবে আক্রান্ত হলো এতো মানুষ এই প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসে তার প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে, ২০১৪ সালের এই মহামারীর মাত্র ক’মাস আগে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র দু’বছরের একটি বালক-গিনির একটি গ্রামে। বালকটি অসুস্থ হবার পর পরই মারা যায়-গত ডিসেম্বরের ৬ তারিখে। একসপ্তাহ পরে ঠিক একই ধরনের অসুস্থতায় ভুগে মারা যায় বালকটির মা। তারপর ঐ বালকের তিন বছর বয়সী বোনটিও অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তার কিছুদিন পরেই মারা যায় তাঁদের গ্র্যান্ডমাদার। অর্থাত্ মৃত চারজনই হচ্ছেন একই পরিবারের সদস্য। তাঁদের সকলেরই অসুস্থতার লক্ষণগুলো ছিল প্রায় একইরকম অর্থাত্ জ্বর, বমি এবং ডায়রিয়া। যদিও তখন তাঁদের এই অসুস্থতার প্রকৃত কারণ ছিল সকলের কাছে অজানা। পরবর্তীতে অন্য দু’জন ব্যক্তি যারা ঐ গ্র্যান্ডমাদারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরাও ঐ একই ধরনের অসুস্থতাবোধ করেন অর্থাত্ আক্রান্ত হয়েছিলেন তাঁরা ইবোলা ভাইরাসে। এই রোগটি নিয়ে পরে সশরীরে তাঁরা চলেও যান তাঁদের নিজ গ্রামে। সেখানে তাঁদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী। তিনিও আক্রান্ত হন এবং অন্য আরেকটি গ্রামে চলে যান। এভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে গিনির চারিদিকে। আসলে উপরোক্ত ব্যক্তিগুলোর কেউই তখনো জানতেন না যে তাঁরা এই প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং এটিকে তাঁরা যেমন বহন করছেন, তেমনি সংক্রমণও করছেন অন্যকে। গত মার্চে গবেষকদের একটি টিম যখন এই রোগটি সনাক্ত করলেন, তখন ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। গিনির প্রায় আটটি গ্রামে ইতিমধ্যেই কয়েকডজন মানুষ ইবোলাতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশে (সিয়েরালিয়ন, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়াতে) ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে তীব্রভাবে আশংকা বাড়ায় গবেষকদের মাঝে- যা সত্যে প্রমাণিত হল ১০১৩ জনের মৃত্যু এবং ১৮৪৮ জন ইবোলা সাসপেকটেড কেস সনাক্তের মাধ্যমে (আগস্ট ৯, ২০১৪ অবধি)। এই সংক্রমণ যাতে আর না বাড়ে বা মহামারী পর্যায়কে কিভাবে এড়ানো যায়- সে সম্পর্কে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি করেছেন। তাঁদের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে অনেক তথ্য ও আপডেট দেয়া আছে। আমেরিকার সিডিসি বা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন তাঁদের ওয়েবসাইটে ইবোলা সম্পর্কে সতর্কীকরণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন এয়ারলাইন্স পশ্চিম আফ্রিকার ঐ দেশগুলোতে তাঁদের নিয়মিত ফ্লাইট বাতিল করেছেন (যেমন, ব্রিটিশ ও এমিরেটস) অথবা সীমিত আকারে চালু রেখেছেন। এফডিএ (Food and Drug Administration) অনুমতি দিয়েছেন কানাডিয়ান কোম্পানি “টেকমিরা বায়োটেক”কে তাঁদের TKM-ইবোলা ড্রাগটি সীমিত আকারে ব্যবহারের জন্য। “টেকমিরা বায়োটেক” এই ড্রাগটির (অলিগোনিউক্লিওটাইড টাইপ ড্রাগ) Large Scale Production-এর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আমেরিকার নিত্য এভেশিয়া বায়োটেকনোলজির সঙ্গে। এতোসব কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবোলা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা। এখানে উল্লেখ্য যে, ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সর্বপ্রথমে পরিলক্ষিত হয় একইসঙ্গে আফ্রিকার দুটি দেশে- কঙ্গো এবং সুদানে- ১৯৭৬ সালে। ভাইরাসটি দেখতে ঠিক তন্তু বা সুতার ন্যায়। এটি দেহে সংক্রমিত হলে এটির লক্ষণ/উপসর্গ পরিলক্ষিত হয় দীর্ঘসময় ধরে অর্থাত্ ২১ দিন পর্যন্ত। উপসর্গগুলো যেমন- জ্বর, মাথাধরা, পেটের ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, ক্ষুধামন্দা, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি। যারা আক্রান্ত হয় তাঁরা সকলেই যে মারা যায় তা নয়। তবে অধিকাংশই মারা যায়। কারণ এর বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কিভাবে এই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রথমে সংক্রমিত হয়েছিল তা অজানা থাকলেও গবেষকদের ধারণা যে, ভাইরাসটি কোনো আক্রান্ত পশুর দেহ থেকেই মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছিল। সংক্রমিত হতে পারে কীভাবে? যেমন :১. আক্রান্ত পশুর মাংস খেলে, ২. আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে নির্গত তরল পদার্থ যেমন-রক্ত, লালা, প্রস্রাব, ঘাম, বীর্য থেকে অথবা ডায়রিয়া বা বমির সংস্পর্শে আসলে, ৩. ব্যবহূত মেডিক্যাল সামগ্রীর মাধ্যমে যেমন সিরিঞ্জ, নিডল (Contaminated, non-sterile)। ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে কীভাবে? পরিবার ও কাছের মানুষ এবং বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমেই এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে সবচেয়ে বেশি। এর মূল কারণ হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যায় সর্বপ্রথমেই এগিয়ে আসেন এই কাছের মানুষগুলো। তাছাড়া ক্লিনিক বা হসপিটালের কর্মীদের (নার্স বা ডাক্তার) মাধ্যমেও এই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে যদি স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের নিজেদের Proper Protection Equipment (PPE) যেমন মাস্ক, গাউন বা গ্লোভস পরিধান না করে ইবোলা আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। যে ইকুইপমেন্টগুলো ব্যবহূত হবে যেমন সিরিঞ্জ, নিডল, সেগুলোকে সঠিকভাবে পরিষ্কার অথবা বীজাণুমুক্ত (sterilization) এবং পরিত্যাগ করা এই রোগ এড়ানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহূত ইকুইপমেন্টগুলোকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বীজাণুমুক্ত ছাড়া ভাইরাস সংক্রমণ যেমন চলতে থাকবে তেমনি এর প্রাদুর্ভাবও সমপ্রসারিত হবে। এখানে বলে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, ইবোলা রোগটি নিরাময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক এখনো নেই, তবে Development পর্যায়ে বেশ কিছু ড্রাগ রয়েছে। আমার জানামতে যে কয়েকটি “ড্রাগ ডিসকভারি ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি” দীর্ঘদিন ধরে ইবোলা টার্গেট নিয়ে এর প্রতিষেধক নির্ণয়ে গবেষণায় নিয়োজিত আছেন, তাঁদের মধ্যে কানাডিয়ান কোম্পানি “টেকমিরা বায়োটেক” অন্যতম। সমপ্রতি এফডিএ আফ্রিকার ইবোলা ইনফেকটেড রোগীদের চিকিত্সার স্বার্থে “TKM-Ebola ড্রাগটি সীমিত আকারে” ব্যবহারের জন্য “টেকমিরা বায়োটেক”কে অনুমতি দিয়েছেন। লেখক :ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত alamrowshon¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন