অসংখ্য ছড়ানো-ছিটানো রক্তাক্ত লাশের ভেতর হইতে লাফাইয়া লাফাইয়া একটি ছেলে তাহার স্বজনদের মৃতদেহ খুঁজিতেছে। কোথায়? না, কোনো মর্গে নহে, লাশগুলো রাখা আছে সবজি ফলমূল সতেজ রাখিবার হিমাগারে। এমন একটি দৃশ্য এই মাসের প্রারম্ভে আমরা দেখিয়াছি। গত ৮ জুলাই শুরু হওয়া যুদ্ধে এত বেশি অসামরিক ও নিরীহ ফিলিস্তিনি মারা পড়িয়াছে যে, মৃতদেহগুলোকে মর্গে রাখিবার জায়গার অভাব দেখা দিয়াছে। তাই যেই শীতলঘরে ফলমূল সবজি সংরক্ষণ করা হয়, সেখানেই মৃত মানুষের স্তূপ! সেখানে শিশু হইতে বৃদ্ধ, মাঝবয়সী হইতে সন্তানসম্ভবা—কাহার মৃতদেহ নাই? সাদা প্লাস্টিকে মোড়া নানা বয়সের লাশ। চুয়াইয়া পড়িতেছে রক্ত। ভিজা সপসপে মেঝে। আর তাহারই মধ্যে ঝাপসা চোখে অতি সাবধানে পা ফেলিয়া চলিয়াছে এক স্বজনহারা ফিলিস্তিনি। কাহারা মারা পড়িতেছে এই যুদ্ধে? মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলিতেছে, প্রায় দুই হাজার নিহত মানুষের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা দশ হাজার! গাজার নিরীহ আহতদের চিকিত্সা সেবা প্রদানেও এই সময় ফিলিস্তিনিদের অসহায়ত্ব মানবতার মর্মমূলে পীড়া দেয়। আহতদের অধিকাংশই মারা যাইতেছেন বিনা চিকিত্সায়। সেখানকার হাসপাতালসমূহে আহতদের তিল ধারণের জায়গা নাই। এমতাবস্থায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাজার আহত নারী-পুরুষ ও শিশুদের চিকিত্সা সেবায় বাংলাদেশ হইতে সরকারিভাবে ওষুধ সামগ্রীসহ মেডিক্যাল টিম প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন। এই মেডিক্যাল টিমে চিকিত্সক ছাড়াও থাকিতেছেন নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট। এই প্রশংসনীয় উদ্যোগ মানবতার কেতনকেই ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরে।
ছোট্ট ভূখণ্ড ফিলিস্তিনের গাজার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসর আর উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে ইসরায়েল। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর দেশটির সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হইয়াছিল। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে ফিলিস্তিন দেশটি কোণঠাসা হইতে হইতে এখন দুইটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে পরিণত হইয়াছে। একটি গাজা স্ট্রিপ অপরটি ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক। ১১ কোটি ফিলিস্তিনির প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কোনো রকমে গাজা এবং পশ্চিম তীরে বসবাস করিতে পারিতেছে, বাকিরা উদ্বাস্তু হইয়া আশ্রয় লইয়াছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এইরকম এক ভৌগোলিক অবস্থানে থাকিয়া গাজায় গত ৮ জুলাই একটি অপহরণ ও হত্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া আকাশপথে শুরু হয় ইসরাইলের বোমারু-বিমানের আক্রমণ। মাঝে কয়েকবার যুদ্ধবিরতি, সেই বিরতি শেষে আবার যুদ্ধ। আবার চলিতেছে যুদ্ধ বিরতি। এই বিরতি স্বল্পকালীন নাকি দীর্ঘকালীন—তাহা স্পষ্ট নয় এখনও। যুদ্ধের দামামার জীবন্ত বর্ণনা আবিদ নামে গাজার এক বাসিন্দা এইভাবে দিয়াছেন—মনে হইতেছিল কোনো অ্যাকশন সিনেমা দেখিতেছি। চারিদিকে বিস্ফোরণ! আগুনের শিখার সঙ্গে আকাশে লাফাইয়া উঠিতেছে গাড়ি। বাড়িঘরে ক্রমাগত রকেট আসিয়া পড়িতেছে। ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়িতেছে জলজ্যান্ত মানুষ।
যুদ্ধে যাহাতে নারী ও শিশু হত্যা ও অত্যাচারের শিকার না হয়, তাহা প্রতিহত করিতে ২০০০ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু তাহাও যেন অমা-রজনীর কালো আঁধারে লুকাইয়া আছে। এই নিরপরাধ বেসামরিক এবং বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুর মৃত্যু লইয়া বিশ্ববিবেক কি বিমর্ষ হয় না? মৃত্যু উপত্যকা গাজায় যেন ‘সবার ওপরে যুদ্ধ সত্য’, মানবতা সেখানে মুখ লুকাইয়া কাঁদে। গাজার মৃত্যুমিছিলের এই গ্লানি সমগ্র মানবজাতির, এই পরাজয় মনুষ্যত্বের। বিশ্বশান্তির জন্যই তাহার অবসান আবশ্যক।
