১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। হোয়াইট হাউস জেগে উঠেছে সকাল হওয়ার অনেক আগে। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সারারাত ঘুমোতে পারেননি। এপাশ-ওপাশ করেছেন। ভেতরে এক ধরনের উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনা। এ এক অধীর অপেক্ষা একটি অনন্যসাধারণ মুহূর্তের জন্য। হোয়াইট হাউসের দখিনের সবুজ লনে ফুটেছে নানা বর্ণের হৈমন্তী ফুল ক্রিসেনথিমাম। ফুলের ঝোঁপের ফাঁকে দোয়েল পাখি শিষ দিয়ে যেন আবাহন করে চলেছে অনাস্বাদিত সেই মুহূর্তটিকে। সেদিন সকালে ঝলমলে রোদ ছিল। হেমন্তের রোদেলা সকাল প্রস্তুত একটি ঐতিহাসিক করমর্দনের সাক্ষী হয়ে থাকার জন্য। আজন্ম দুশমন দুটি জাতির দুই নেতা আজ এখানে হাত মেলাবেন, শান্তির পথে শুরু হবে নতুন অভিযাত্রা। অগণিত নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষের রক্তে ভেজা ফিলিস্তিনে ফিরে আসবে শান্তি ও স্বস্তি। আজ এখানে কেউ বিজেতা নয়, কেউ পরাস্ত-পরাভূত নয়। দুই নেতা; একজন আজীবন সংগ্রামী ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, আরেকজন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন।
নির্ধারিত সময়ে তারা দুজন এলেন দখিনের উদ্যানে। ইয়াসির আরাফাতের অবয়বে আজ ক্লান্তির চিহ্নমাত্র নেই। মুখে সেই অমলিন হাসি। আইজাক রবিন খানিকটা বিমর্ষ। সব দ্বিধা যেন তিনি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এমনও হতে পারে ইয়াসির আরাফাতের মোটা খাকি পোশাক আর ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি রবিনের ভেতরে মুহূর্তের জন্য হলেও জাগিয়ে দিয়েছিল প্রাচীন জাতিবিদ্বেষ। কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই পিএলও নেতার। হাসি মুখে তিনি হাত বাড়ালেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন আইজাক রবিনও, যদিও জড়তা ছিল সামান্য। ঝিলিক দিয়ে উঠলো অপেক্ষমান সহস্র ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরার আলো। সেই মুহূর্তে পরস্পরের চোখে চোখ রাখলেন তারা দুজন। রবিন বললেন, আপনি কি জানেন, আমরা সাংঘাতিক কঠিন একটা কাজ করতে যাচ্ছি?
জানি। আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই এসেছি।’ অকৃত্রিম কণ্ঠে বললেন ইয়াসির আরাফাত। রবিন আরো বললেন, অনেক রক্ত ঝরেছে, আর নয়।
করমর্দনরত ইতিহাস সৃষ্টিকারী দুই নেতার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ফটোসেশন হয়ে গেলো। বহু সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা থাকলো ইতিহাসের অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি। এই সময়টির জন্য অপেক্ষা করছিলেন শান্তিকামী বিশ্ববাসী সাড়ে চার দশক ধরে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী টাইমের হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্ট এই দৃশ্যপটের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে রিপোর্ট করলেন। যথারীতি ছাপা হলো পরের সপ্তাহেই। টাইম সাময়িকীর ৮৫ বছরের সেরা লেখাগুলোর মধ্যে এই রিপোর্টটি অন্যতম।
স্মরণীয় সেই হ্যান্ডশেকের পর রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হলো অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা। স্বাক্ষরিত হলো যুগান্তকারী শান্তিচুক্তি। ফিলিস্তিনী জনগণের পক্ষে ইয়াসির আরাফাত মেনে নিলেন ইসরাইলের অস্তিত্ব। ইসরাইলও স্বীকার করে নিল যে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত ফিলিস্তিনী জনগোষ্ঠীর বৈধ প্রতিনিধি। গাজা ও পশ্চিমতীর নিয়ে গঠিত হবে স্বায়ত্তশাসিত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। ক্রমান্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
শান্তির পথে সেই করমর্দন ও চুক্তিকে মাইলফলক হিসাবেই বিবেচনা করেছিলেন বিশ্বসমাজ। এই অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতি হিসাবে পরের বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হলেন ইয়াসির আরাফাত ও আইজাক রবিন। কিন্তু বাস্তবে সবকিছুই প্রহসনে পরিণত হতে সময় লাগেনি খুব বেশি। ক্রমে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল শান্তির মাইলস্টোন। ইসরাইলের চরমপন্থী জায়নবাদীরা শান্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ করতে শুরু করলো তীব্র প্রতিক্রিয়া। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে রক্ষণশীল লিকুদ পার্টি মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তি নস্যাত্ করে দিতে মাঠে নামল সর্বশক্তি নিয়ে। হেবরনের একটি মসজিদে ইহুদি মৌলবাদীরা নামাজরত ফিলিস্তিনীদের ওপর গুলি চালালো নির্বিচারে। নিহত হলেন বহু ফিলিস্তিনী। ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর হত্যা করা হলো আইজাক রবিনকে। তেলআবিবে শান্তি মিছিল করে ফেরার পথে এক মৌলবাদী ইসরাইলির ছুরিকাঘাতে নিহত হন তিনি। সেই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইতিহাসের চাকা আবারও চলতে শুরু করলো পেছন দিকে। ১৯৯৬ সালে মাত্র ১ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে নেতানিয়াহু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে আরো দ্রুত।
১৯৯৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নতুন করে শান্তির রোডম্যাপ ঘোষণা করা হলো। ২০০৫ সালের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলো। কিন্তু সকলই গরল ভেল। পশ্চিমতীরে ইসরাইলী বসতি স্থাপন শুরু হলো নতুন করে। ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাতকে একদিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয়নি তেলআবিব। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় দুই বছর ইসরাইলী সেনাবাহিনী ইয়াসির আরাফাতকে গৃহবন্দী করে রাখে। কোনো আবেদন-নিবেদন, নিন্দা প্রতিবাদে কর্ণপাত করেনি ইসরাইল। সেই বছর ৪ নভেম্বর প্যারিসে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের পরম বন্ধু ইয়াসির আরাফাত। এখনও অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে এই মহান নেতার মৃত্যু রহস্য! আর এখন গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা কারো অজানা নয়। গোটা অঞ্চল পরিণত হয়েছে মৃত্যু উপত্যকায়। শত শত নিষ্পাপ শিশুর রক্তে রঞ্জিত নেতানিয়াহুর হাত। ভুলুণ্ঠিত মানবতা। শান্তির ললিত বাণী শোনাইছে ব্যর্থ পরিহাস, এখন অবশ্য যুদ্ধ বিরতি চলছে। কে জানে এই অবসরে হয়তো লেখা হচ্ছে প্রহসনের নতুন কোনো পাণ্ডুলিপি।
email: [email protected]
