৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে ইসি ও সরকার ভোটের হিসেব যা-ই দেখাক না কেন, দেশের মানুষ জানে কত ভোট তারা দিয়েছিলেন। এই নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক আছে, তা নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। সরকার ও সরকারি দলের বাড়াবাড়ির তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। জনমনে অসন্তোষ আছে। সরকারবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন কিংবা আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতির সমর্থক কর্মীরও অভাব নেই। তারপরেও বাস্তবতা এই যে, বিরূপ মনোভাব পোষণ করা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারকে মেনে নেয়া ছাড়া সাধারণ মানুষের আর কোন গত্যন্তর নেই। কারণ যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব। কাণ্ডারি যদি শক্ত হাতে হাল ধরতে না জানেন, তাহলে তরী যত মজবুতই হোক না কেন, সে একাত-ওকাত হবেই, ডুবোচরে সে আটকে যাবেই। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কিংবা জনসাধারণের প্রত্যাশার অনুকূলে কোন আন্দোলন এ দেশে হয়নি। ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি, জুলুম-পীড়ন এদেশে চলতে পারে প্রায় বিনা বাধায়। একজন বিখ্যাত বীরের একটি উক্তি মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন, আমি ভেড়ার নেতৃত্বে সিংহের দলকে ভয় পাই না। কিন্তু সিংহের নেতৃত্বে ভেড়ার দলকেও ভয় পাই। জনসাধারণ যত সাধারণই হোন না কেন , গরীব, কম শিক্ষিত, কমবখ্ত—যাই হয়ে থাকুন না কেন, তাদের মিলিত শক্তির সঙ্গে সিংহের তুলনা করা মোটেও কোনো বাতুলতা নয়। তা যে নয়, ইতিহাসই তার বড় সাক্ষী। কিন্তু যথার্থ নেতৃত্বের অভাবে সেই শক্তি মূল্যহীন, হীন দুর্বল। রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দান থেকে সংগ্রামী মানুষকে সামপ্রতিক অতীতে অনেকবার হতোদ্যম হয়ে, পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে। দক্ষ সেনাপতির অভাবে। ক্ষেত্রবিশেষে হতে হয়েছে অত্যাচারিত।
পাঠক, বর্তমান সময়ের একটি উদাহরণ তুলে ধরে লেখার শেষ করতে চাই। ফিলিস্তিনের দুর্বল হামাসের বিরুদ্ধে বিশ্বের প্রথম শ্রেণির শক্তিসম্পন্ন ইসরাইল বাহিনী লড়ছে। অনেক শক্তি ক্ষয় করেও এখনও পর্যন্ত বিজয় লাভ করতে পারেনি তারা। বরং হামাসকে ভয় পাচ্ছে । কারণ সিংহের ন্যায় ব্যক্তির নেতৃত্ব পেয়েছে হামাস। হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জাদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের দৃঢ়-সংকল্পের এই কমান্ডারের নাম হাম্মাদ দেইফ। এবারের গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের এত সেনা-ক্ষয়ের নায়ক মুহাম্মাদ দেইফকে ইসরাইল জমদূত হিসেবে দেখছে। ইসরাইলের সেনাবাহিনীর ঘুম হারাম করে দেয়া এই কমান্ডার একজন ‘সামরিক পণ্ডিত’ যার আরেক পরিচয় ‘গেরিলা যুদ্ধের ছাত্র’। হামাসের এই কমান্ডারের ওপর পাঁচবার বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। তবে তিনি প্রতিবারই বেঁচে গেছেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে হামাসের দুর্বল যোদ্ধারা ইসরাইলি বাহিনীর কাছে মূর্তিমান আতংকে পরিণত হয়েছে। ১৯৬৫ সালে গাজার খান ইউনুস শহরের এক উদ্বাস্তু শিবিরে জন্মগ্রহণ করা এই বীর কমান্ডার এখন ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে বড় বীরের ভূমিকা পালন করছেন।
হামাসের লড়াইয়ের সাথে বাংলাদেশের কিংবা অন্য কোনো দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের তুলনা চলে না। কেননা, হামাস লড়ছে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য। সেই সংগ্রাম সশস্ত্র। কিন্তু গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অস্ত্রের কোনো স্থান নেই। তাহলেও এখানে হামাসের দৃষ্টান্ত টানা শুধু নেতৃত্বের দৃঢ়তা, সাহস ও দলীয় শৃঙ্খলা ধরে রাখবার দক্ষতার বিষয়গুলো বুঝাবার জন্য। সামরিক যুদ্ধের ময়দান ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মাঠ—এ দুইয়ের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত ব্যবধান থাকলেও নেতৃত্ব কিন্তু একইরকম গুণাবলী দাবি করে। উভয়ক্ষেত্রে নেতৃত্বের দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা, কৌশল ইত্যাদির গুরুত্ব অনুপেক্ষনীয়।
জনগণের ইচ্ছা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজয় অর্জন তখনই সমভব, যখন নেতা হবেন নেতারই মতন দৃঢ়, নির্মোহ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন।
লেখক :সাংবাদিক
