প্রস্তাবিত সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট ও জনপ্রশাসন

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৩
সরকার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। সাংবিধানিক ও আইনগত বৈধতা এর প্রাণভোমরা। সরকারের অনেক কাজের মধ্যে অন্যতম হলো: কে কখন কিভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং রাষ্ট্র প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ-সুবিধার অপর্যাপ্ততার কারণে কোন সরকারই সকল নাগরিকের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারে না। অর্থাত্ ক্ষমতাসীন সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও নাগরিকদের কোন কোন অংশ প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এমতাবস্থায়, আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের রীতি হচ্ছে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সম্মতিক্রমে সম্পদ আহরণ, নিয়ন্ত্রণ, বন্টন এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট সুযোগ-সুবিধা বন্টনের নীতিমালা প্রণয়ন এবং নৈর্ব্যক্তিকভাবে তা অনুসরণ করে বন্টন কার্যক্রম সম্পাদন করা। আমলাতান্ত্রিক নীতি হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে এমনভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা, যেন কেউ পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি, প্রতারণা কিংবা বিধি-বিধান লঙ্ঘনের মতো কোন অভিযোগ উত্থাপন করতে না পারে। আর এ জন্যই আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইনগত নিয়ন্ত্রণের কোন বিকল্প নাই। ভারত সরকার সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস (সিএসএস)-এর মাধ্যমে সৃষ্ট ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসকে (আইসিএস) ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস-এ রূপান্তরিত করে। এই সার্ভিসসহ অন্য সর্বভারতীয় সার্ভিস ও প্রাদেশিক সার্ভিসসমূহের বিদ্যমান কাঠামো ও পদ্ধতির কোন ব্যাপক পরিবর্তন ছাড়াই ভারতীয় প্রশাসনে আত্তীকরণ করে। ভারতে এই আত্তীকরণ প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার পর পার্লামেন্ট ১৯৫১ সালে অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস অ্যাক্ট পাস করার মধ্য দিয়ে একটি আইনি ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ফলে সে দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠেনি। পক্ষান্তরে, পাকিস্তানের গণপরিষদ ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দেশটির জনগণকে কোন সংবিধান উপহার দিতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবেই ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন অনুযায়ী পাকিস্তান পরিচালিত হয়েছে। অর্থাত্ পাকিস্তানে আইসিএসসহ অন্য কেন্দ্রীয় সার্ভিস ও প্রাদেশিক সার্ভিসসমূহকে আত্তীকরণের বিষয়ে ব্যাপক কোন রাজনৈতিক ও সংসদীয় আলোচনা হয়নি। শুধুমাত্র নির্বাহী আদেশে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করে আইসিএস অফিসারদের আত্তীকরণ করা হয়। পরে ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান মন্ত্রিসভা এক প্রস্তাবের মাধ্যমে পাকিস্তান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসকে পরিবর্তন করে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) করে। তাই দেখা যায়, পাকিস্তানে আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারতের মতো কোন সংসদীয় অ্যাক্ট ছিল না। এতদ্সত্ত্বেও সিএসপিসহ অন্য কেন্দ্রীয় সার্ভিস ও প্রাদেশিক সার্ভিসসমূহের অফিসারদের নির্বাচন, নিবিড় প্রশিক্ষণ, চাকরিকালীন তাদের নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সততার বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়নের কারণে পাকিস্তানে মোটামুটি একটি মেধাভিক্তিক দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সিএসপি অফিসারদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও এলিটিস্ট মনোভাবের কারণে পূর্ব পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনৈতিক নেতাদের কাছে তারা সেভাবে আদৃত হননি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থাকে সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস করার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আর এই উদ্যোগের ফলে সরকারি কর্মে কর্মকর্তা নিয়োগ ও দেশের বিভিন্ন কর্মব্যবস্থা বা চাকরিগুলোর সকল কর্মকর্তাকে এক নতুন কাঠামোয় ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত করা হয়। এতে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এলিট ক্যাডারের তিরোধান হয়। সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নামে একটি একক ও সমন্বিত সার্ভিস। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে আছে— ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, এই উদ্দেশ্যে আইনের দ্বারা বা অধীন বিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত অনুরূপ কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করিয়া বিধিসমূহ প্রণয়নের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে এবং অনুরূপ যে কোন আইনের বিধানবলি সাপেক্ষে অনুরূপ বিধিসমূহ কার্যকর হইবে’। আবার সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানবলি-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, সংসদের আইন দ্বারা যে কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন বা আইনগত কার্যকরিতা সম্পন্ন অন্যান্য চুক্তিপত্র প্রণয়নের ক্ষমতার্পণ হইতে এই দফায় কোন কিছুই সংসদকে নিবৃত্ত করিবে না’। প্রশাসনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ খারাপ কিছু নয়, সব দেশেই কমবেশি তা আছে। কিন্তু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রকৃতি হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক। খেয়াল খুশি বা নিজস্ব ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে নয়। সেটি হবে নির্বাচনী ইশতেহার ও দলীয় আদর্শভিত্তিক। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কর্ম তত্পরতার উপযোগী বাতাবরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই অ্যাক্টে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, পদায়ন, বেতন-ভাতা নির্ধারণ, শাস্তির পূর্বে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা, অবসর গ্রহণের বিধানসমূহ উল্লেখ থাকবে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। একটি দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন দেশবাসীকে উপহার দেয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার যে সদিচ্ছা ব্যক্ত করেছে তা অভিনন্দনযোগ্য। সিভিল সার্ভিস অ্যাক্টের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের উপর সরকারের যেমন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে তেমনি আমলাতন্ত্রের সদস্যদের তথা সরকারি কর্মকর্তাদেরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমা নির্ধারিত হবে। আমলাতান্ত্রিক সদস্যদের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে সতর্কতার সঙ্গে এবং অব্যাহতভাবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, আচার-আচরণ ও চাল-চলনে এমন এক আবহ সৃষ্টি করা, যাতে সংশ্লিষ্ট সব মহল তাদের সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। জনপ্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যেন সুষ্ঠুভাবে তাদের কাজ পরিচালনা করতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো, লোকবল, অর্থ ও অন্যান্য সহায়ক সার্ভিস প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে সরকার জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ করে সুশাসনের দ্বার উন্মোচন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। লেখকদ্বয়:প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ও সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন