গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৪, ২০:৩৩
মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট সতর্ক সংকেত পর্ব— ১৮ আকাশ মেঘলা। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। কমলা বললেন— আজকে অফিসে না গেলে হয় না? কেন? বললেন নীলকান্তবাবু। না, বলছিলাম আকাশের অবস্থা তো ভালো না, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। তাই নাকি ! তিন নম্বর সতর্ক সংকেত মানে হলো বন্দর দমকা হাওয়ার সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা। এতে ভয়ের কিছু নেই। আকাশ জিজ্ঞেস করলো— সংকেত এক আর দুই কী মামা? নীলকান্তবাবু বললেন— এক নম্বর সংকেত হলো দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত। দূরের সমুদ্রে প্রবাহিত বাতাস ঝড়ে পরিণত হতে পারে। দুই নম্বরটাও দূরবর্তী হুশিয়ারি সংকেত। এতে দূর সাগরে ঝড় উঠেছে বোঝা যায়। চার নম্বরে বোঝা যায় বন্দরে ঝড় আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। নদীবন্দরগুলো, যেমন নারায়ণগঞ্জ, ভৈরব এসব স্থানে চার নম্বর পর্যন্ত সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়। কমলা বললেন— নদীবন্দর আর সমুদ্রবন্দরের সংকেত এক নয়? কিছুটা পার্থক্য আছে —বললেন নীলকান্তবাবু। যেমন ধরো, নদী বন্দরে এক নম্বর সতর্ক সংকেত হলো এলাকার ওপর দিয়ে অস্থায়ী দমকা হাওয়া বয়ে যাবার সম্ভাবনা। দুই নম্বর সতর্ক সংকেত হলো 19.41 মিটারের চেয়ে ছোট নৌযানকে অতি দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে হবে। তিন নম্বরটা হলো নদী বন্দরের জন্য বিপদ সংকেত। এর মাধ্যমে বোঝা যায় এলাকায় ঝড় আঘাত হানার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চার নম্বর মহাবিপদ সংকেত হলো অতি শীঘ্র প্রচণ্ড ঝড় আঘাত হানবে। ফলে সব রকমের নৌযানকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। কণিকা দৌড়ে এসে বললো— বাবা, সতর্ক সংকেত এখন চার নম্বরে। টিভির স্ক্রলে দেখাচ্ছে। কমলা বললেন— তুমি অফিস যাওয়া বাদ দিয়ে দাও। না, না —বাধা দিলেন নীলকান্তবাবু। অফিস যাওয়া বাদ দিলে হবে কীভাবে? কমলা বললেন— আমার ভয় লাগছে। ভয়ের কিছু নেই। চিটাগাং সমুদ্রবন্দরে চার নম্বর সতকর্ সংকেত, আর এখানে সিলেট অনেক দূরে। না না, গত আইলা আর সিডরের সময়ে সিলেটের ওপর দিয়ে তো কম ঝড় বয়ে যায়নি। মূল ঝড় তো গেলো সাতক্ষিরা বা ঐ অঞ্চল দিয়ে। আমরাও তো ভোগান্তিতে পড়েছিলাম। গাছ পড়ে, কারেন্টের খুঁটি, টেলিফোনের খুঁটি পড়ে রাস্তা বন্ধ থেকে ছিলো মনে নেই তোমার? কিচ্ছু হবে না। আমি বের হয়ে যাচ্ছি, ছাতাটা দাও। বললেন নীলকান্তবাবু। তাড়াতাড়ি চলে এসো— কমলা বললেন। নীলকান্তবাবু চলে যাবার পর কমলার টেনশন আরো বেড়ে গেলো। এরমধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে পাঁচ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। টিভিতে বারবার পড়ছে এই সংকেতগুলো। কণিকা ফোন করলো নীলকান্তবাবুর অফিসে। বাবা, বিপদ সংকেত পাঁচ মানে কী? নীলকান্তবাবু বললেন, ছোট বা মাঝারি তীব্রতা সম্পন্ন ঝড়ের কারণে বন্দরে তীব্র হাওয়া বিরাজ করবে। এ ঝড় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বন্দরের দক্ষিণ উপকূল দিয়ে এবং মংলায় পূর্ব উপকূল দিয়ে অতিক্রম করার আশংকা রয়েছে। কণিকা বললো— তুমি কখন আসবে বাবা? কেন? এখন ছয় নম্বর বিপদসংকেত দেখাতে বলা হচ্ছে। ছয় নম্বর মানে কী? নীলকান্তবাবু বললেন— বিপদসংকেত পাঁচ আর ছয় এর মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। পাঁচ নম্বরে চট্টগ্রাম কক্সবাজারের দক্ষিণ উপকূল দিয়ে আর মংলায় পূর্ব উপকূল দিয়ে অতিক্রম করবে। ছয় নম্বর বিপদসংকেত হলো চট্টগ্রাম কক্সবাজার বন্দরের উত্তর উপকূলভাগ দিয়ে আর মংলায় পশ্চিম উপকূল অংশ দিয়ে অতিক্রম করার আশংকা দেখা দিয়েছে। কণিকা বললো— আকাশ আর চন্দ্রা তো এদের মায়ের কথা চিন্তা করে অস্থির। না না, ওদেরকে বল চিন্তা না করতে। আমি কক্সবাজার ফোন করছি এখনি। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো বাবা। বললো কণিকা। নীলকান্তবাবু ছোট বোনকে ফোন করলেন কক্সবাজারে। ফোন ধরলেন সবুজবাবু— আকাশ চন্দ্রার বাবা। বললেন— এখন মহাবিপদ সংকেত নম্বর সাত। বন্দরের ওপর বা নিকট দিয়ে প্রত্যাশিত ছোট বা মাঝারি গতি সম্পন্ন ঝড়ের কারণে বন্দরে তীব্র ঝড়ো হাওয়া বিরাজ করবে। তবে চিন্তা করবেন না। আমরা সব রকম পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছো? বললেন নীলকান্তবাবু। সবুজ বললেন— আমরা আলোর সোনা-রূপা, নগদ টাকা, সার্টিফিকেটগুলো, দলিলপত্র, লাইসেন্স পলিথিন দিয়ে মুড়ে একটা কলসিতে ঢুকিয়ে উঠানের মাটিতে পুঁতে রেখেছি। উড়িয়ে নিয়ে যাবার সম্ভাবনা নেই। আলো কী করছে, খুব ভয় পাচ্ছে? না না, আমরা তো কয়দিন পরপরই এরকম বড়বড় ঝড়ের মোকাবেলা করে থাকি। আলোকে একটু ফোনটা দাও তো। ফোন পেয়ে ছোট বোনকে বললেন— কী রে আলো ভয় পাচ্ছিস? না দাদা, ভয় পাবো কেনো ! চন্দ্রা আকাশ কী করছে? হ্যাঁ, এরা সবাই ভালো। তোর কথা চিন্তা করছে , তবে তোর বৌদি খুব ভয় পাচ্ছে। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিলেন নীলকান্তবাবু, চলে যাবেন বাসায়। রাস্তাঘাটে লোকজন কম। তাঁকে বাসায় পেয়ে সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। অণু বললো— বাবা, বিপদসংকেত কত পর্যন্ত হয়? নীলকান্তবাবু বললেন— দশ বা এগারো। মহাবিপদসংকেত আট হলো চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বন্দরের দক্ষিণ উপকূল দিয়ে এবং মংলার পূর্ব উপকূল দিয়ে অতিক্রম করবে বলে সম্ভাব্য প্রবল ঝড়ের জন্য বন্দরে তীব্র ঝড়ো হাওয়া বিরাজ করবে। আর মহাবিপদসংকেত নম্বর নয়টাও একই রকম। তবে এটি চট্টগ্রাম কক্সবাজার বন্দরের উত্তর উপকূল আর মংলার পশ্চিম উপকূল দিয়ে অতিক্রমকারী ঝড়ের জন্য তীব্র হাওয়া বিরাজ করবে। আর দশ নম্বর? জিজ্ঞেস করলো রেখা। সে এতোক্ষণ নীরবে শুনছিলো। দশ নম্বর হলো এই ঝড় বন্দরের ওপর বা নিকটে এসে গেছে। আর এগারো হলো আবহাওয়া সতর্ক কেন্দ্রের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে উদ্যত। তোর কী ভয় করছে? রেখা বললো— ভয় করবে কেন বাবা? তাহলে একটা গান ধর। রেখা গান ধরলো— যদি ঝড়ের মেঘের মতো আমি ধাই, তবে দয়া করো হে।