ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৬
এ কদা ‘‘তিলোত্তমা” তথা সুন্দরের রানি হবার স্বপ্ন দেখতো ঢাকা। সে স্বপ্ন কবেই গুড়ে বালি! তার বদলে বিশ্বের এক নম্বর “বাসের অযোগ্য” শহরের তালিকায় নাম উঠেছে সেই কবেই- এখন কিনা ইজ্জত বাঁচানোই দায়! নগর জীবনের সমস্যাগুলোই ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে এখানে, যেমন:যানজট, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুত্ বিভ্রাট, পানীয় জলের অভাব, বায়ু দূষণ আর বর্জ্য অব্যবস্থাপনা। এত কিছুর পরও এর জনবসতি বাড়ছে হু হু করে—আর তার স্থান সংকুলান হচ্ছে খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা, উদ্যান-বাগান, খেলার মাঠ এসব কিছু বিনাশ করে। ফলাফল, যা হবার তাই—দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সারা শহর সয়লাব। গতবারও এ রকম হয়েছিল, এবার হচ্ছে; এবং আগামীবারও হবে- কারো কোন মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না। বৃষ্টি বিধৌত একটি দেশের অংশ হয়েও ছোটখাট বৃষ্টিতেই এই মহানগরীর প্রায় সব অঞ্চলই জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হচ্ছে। দৃশ্যমান সমস্যা যেমন মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না বা অফিসে যেতে পারছে না—এ সবের পাশাপাশি আরও অনেক সুদূর প্রসারী প্রভাব এর সাথে জড়িত। রাস্তার উপর জল জমে এর আস্তরণগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি, ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের লাইন দূষিত হয়ে রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ছে। ভূগর্ভস্থ সমস্ত ক্যাবল ও বিদ্যুত্-এর লাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দুর্ঘটনারও কারণ হতে পারে এবং হচ্ছে। প্রথমেই আশা যাক জলাবদ্ধতার কারণ বিষয়টিতে। বরাবরের মতই মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন। হাইড্রোলজিক্যাল চক্রের সূত্র অনুযায়ী বৃষ্টির পানি মাটিতে পড়ার পর একটা অংশ মাটির উপর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী ড্রেন বা খালে পড়ে। অপর অংশটি মাটির নিচে শুষে যায় । কিছু অংশ বাষ্পীভবনের মাধ্যমে উড়ে যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত মাটির নিচে চলে যায়, আর মাত্র ১০% মাটির উপরে গড়িয়ে যায়। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে খোলা জায়গাগুলো যদি দালান, রাস্তা ও অন্যান্য স্থাপনা দিয়ে ঢেকে ফেলা হয় তাহলে বৃষ্টির পানির বড় অংশটি আর মাটির নিচে যেতে পারে না— বরং তা মাটির উপর দিয়ে গড়িয়ে ড্রেনে চলে আসছে। আর সেক্ষেত্রে ড্রেনেজ ব্যবস্থাটি যদি পর্যাপ্ত না হয় কিংবা প্রাকৃতিক খালগুলো যদি ভরাট করে ফেলা হয়, সংগত কারণেই সেই পানি জমার আর কোন জায়গা থাকে না—যার অবিশ্যম্ভাবী পরিণতি জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতার উপরোল্লিখিত সবগুলো কারণই ঢাকায় বিদ্যমান। খোলা জায়গা বলতে ঢাকা শহরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ফলে যে পরিমাণ পানির ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেনেজ নির্মাণ করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি পানি তাতে আসছে। আজকাল তার উপর এই ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ। খালগুলো সব ভরাট করা হয়ে গেছে। অন্যদিকে এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরটি রিচার্জ হবার সুযোগও পাচ্ছে না। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে অধিক পরিমাণে পানি উত্তোলন আর অন্যদিকে পানি ভূগর্ভে প্রবেশের সুযোগ না পাওয়া—এ দুয়ে মিলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরটিও অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাচ্ছে—যা পরবর্তীকালে ভূমিধসের মত মারাত্মক দুর্ঘটনারও কারণ হতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে পানীয় জলের অভাবও এক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। অর্থাত্ ঢাকা শহরে হাইড্রোলজিক্যাল চক্রটি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে করে একটি মারাত্মক প্রতিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে আমরা। অথচ সরকারের গুরুত্বের তালিকায় বিষয়টি একেবারেই অবহেলিত। সম্ভবত এর কারণগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে যে বিমান বন্দর বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বাহ্যিক চাকচিক্যের তুলনায় এ বিষয়গুলো কম আকর্ষণীয়। এভাবে চলতে থাকলে আর বেশিদিন বাকি নেই যখন বাঁচার জন্যই এই ঢাকায় বড় বড় সুরম্য অট্টালিকাগুলো ভেঙেচুরে খাল, পুকুর আর উদ্যান বানাতে হবে। ইত্তেফাকেই একবার একটি ছবি দেয়া হয়েছিল যে সাউথ কোরিয়ার একটি ব্যস্ত শহর এলাকা ভেঙ্গে পরবর্তীকালে পার্ক এবং লেক তৈরি করা হয়েছিল প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে। বর্তমানে শহরের ভিতর সরকারি মালিকাধীন যে লেক বা জলাধারগুলো আছে সেগুলোও যদি সঠিকভাবে ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ করা যেত তাহলেও সমস্যাটি এত খারাপে যেত না। এক্ষেত্রে হাতিরঝিল প্রকল্পটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে— তা না হলে এই বিশাল জলাধারটিও এক সময় বেদখল হয়ে যেত। হাতিরঝিলের মত নগরীর আশেপাশের আরও কিছু নিচু জায়গা চিহ্নিত করে যথা: মিরপুরের কল্যাণপুর কিংবা বালু নদীর পাড় বরাবর প্রস্তাবিত জলাধারগুলো সীমানা নির্ধারণ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া এক্ষুণি প্রয়োজন। তাছাড়া বর্ষা আসার আগেই বনানী, গুলশান, ধানমণ্ডিসহ বর্তমান লেকগুলোকে একবার করে খনন করতে বাধা কোথায় ? শুধুমাত্র এই লেকগুলোকে প্রতিবছর বা প্রতি ২-৩ বছর অন্তর যদি খনন করে জমে উঠা পলি সরানো হয় তাহলে এদের ধারণক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেত যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা ও জলাবদ্ধতা উভয় কাজে লাগত। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার ব্যাপারটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ঢাকার চারপাশের শহর রক্ষা বাঁধটির জন্য - যাতে করে ভিতরের পানি বাইরে যাবার একমাত্র পথ কয়েকটি পাম্প স্টেশন এবং তা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। আরও কয়েকটি পাম্প স্টেশন করা এ মুহূর্তে অবশ্য জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সারা শহরের পানি দ্রুত পাম্প স্টেশনে পৌঁছার পথগুলো মোটেই নিরবচ্ছিন্ন নয়—একইভাবে পাম্প স্টেশনের সামনের জলাধারগুলোও পর্যাপ্ত নয় এবং ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে ঢাকার বর্তমান লেক বা জলাধার ও পাম্প স্টেশনগুলোর মধ্যে এক ধরনের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে, বন্যা নিয়ন্ত্রণে ড্যাম-রিজার্ভার সিষ্টেম যেভাবে কাজ করে ঠিক সেভাবে ব্যবহার করা যেত, যা বর্তমানে ঠিক সেভাবে কাজ করছে না। যেমন: মার্চ-এপ্রিলের দিকে ঢাকার সমস্ত লেক ও জলাধারগুলো খালি— ফলে প্রথম বৃষ্টির পানি সহজেই এতে জমা হতে পারে। মে-জুন মাসে আস্তে আস্তে যদি লেকগুলো ভর্তি হয়ে যায় তাহলে পরবর্তী বৃষ্টির পানিটি ধারণ করার কোন জায়গা থাকে না। সেক্ষেত্রে যা করা উচিত তা হচ্ছে এ ধরনের জলধারাগুলোকে সংযুক্ত করে পাম্প স্টেশনগুলোর সাথে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন করা, যাতে করে দুই বৃষ্টির মাঝখানের সময়ে পাম্প করে জলাধারগুলোর পানির লেভেল নিচে নামিয়ে ফেলা হয়। এতে করে পরবর্তী বৃষ্টির পানিটি আবারও এতে ধারণ করা যায়। বলাবাহুল্য, যে উপরোল্লিত সমাধানগুলো যে খুব জটিল বা ব্যয়বহুল তা কিন্তু নয়। সমন্বয়হীনতা ও সদিচ্ছার অভাব। বর্ষা আসলে দায়সারাগোছের কিছু উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় অথচ সারাবছরই কাজ করা উচিত ছিল। সারাবছর ড্রেনগুলো পরিষ্কার করলে, প্রতিবছর লেকগুলো খনন করলে, পাম্প স্টেশনের সাথে পানি প্রবাহটি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে পারলে ঢাকার জলবদ্ধতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে। সর্বোপরি হাজার বার ধরে যে বিষয়গুলো বিশেষজ্ঞ থেকে আরম্ভ করে সুশীল সমাজ বলে আসছে, অর্থাত্ ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ এবং এর খোলা জায়গা ও জলাধারগুলো সংরক্ষণ, এটি কোন সরকারই সম্ভবত গুরুত্বের সাথে আমলে নিচ্ছে না। তবে সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি— সদিচ্ছা থাকলে এখনও সম্ভব জলাবদ্ধতার মত নগর সমস্যাগুলোকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। E-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন