শ্রীকৃষ্ণের জন্ম :লীলাময়ের লীলা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৬
আজ শুভ জন্মাষ্টমী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন! ‘আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন (জন্মাষ্টমী) পালন করি। কিন্তু কেন করি? আমাদের জন্মদিনে “শুভ হোক জন্মদিন” বলে দীর্ঘায়ু কামনা করি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে তার কি কোনো লাভ হয়? তার কি আয়ু বৃদ্ধি পায়! না, তা হয় না। শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন পালন করে কোনো মা-বাবা কি কখনো বলেছে-আমার সন্তান যেন তার মত হয়! কোনো লোক প্রার্থনা করে কি বলেছেন-আমি যেন তার মত হতে পারি’ (জ্ঞানমঞ্জরী-শিবশঙ্কর চক্রবর্তী)! এ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে তিনি সাধুগণের পরিত্রাণ, পাপীগণের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন করেন।’ দ্বাপর যুগের শেষ দিকে ভোজবংশীয় রাজা পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে, রাজা হন কংস। ঈশ্বর বিদ্বেষী কংস, নিজেই সব এ দাবি করে তার আজ্ঞাবহ শ্বশুর জরাসন্ধ, শিশুপাল, কালযবন, চানূর, পূতনা, বকাশূর, দুর্যোধন, দুঃশাসন ইত্যাদির অত্যাচারে সর্বত্র নেমে আসে ত্রাস, সন্তাপ। মানুষের জীবনধারণ দুর্বিষহ। সর্বংসহা পৃথিবীও তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ। অত্যাচার চরম সীমায়। সত্য রক্ষায় ভগবান আসবেন এ-ই সকলের আকাঙ্ক্ষা। আদরণীয়া ছোটবোন দেবকীকে দিয়ে বোনের আনন্দ বর্ধনে কংস নিজেই রথ চালিয়ে বসুদেব-দেবকীকে নিয়ে যাচ্ছেন। গমনকালে কংস শুনতে পায়- “রে মুর্খ ! এত আনন্দ করে যাকে নিয়ে যাচ্ছিস, তার অষ্টম গর্ভের সন্তান তোকে বধ করবে”। দৈববাণী শোনামাত্র বোন দেবকীকে চুলের মুঠি ধরে হত্যা করতে উদ্যত হন। তখন তার ভগ্নীপতি বসুদেব প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, দেবকীর গর্ভজাত সকল সন্তানকে কংসের হাতে তুলে দিবেন। কংস বসুদেবের সত্যবচনে আশ্বস্ত হয়ে তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখল। ভগবানকে কি কোথাও বন্দী রাখা সম্ভব! আর কারাগারে কারা থাকে? অপরাধীগণ। বসুদেব-দেবীর অপরাধ কি? তাদের গর্ভে স্বয়ং ভগবান আসছে— এই তাদের অপরাধ! কারাগারে ভগবদ ধ্যানমগ্ন বসুদেব-দেবকীর দিন যায়, সন্তান হলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বসুদেব তার সন্তান কংসের হাতে তুলে দেন। দৈববাণীর কথা মনে রেখে দেবকীর অষ্টম গর্ভকালে কারাগারে নিরাপত্তা বাড়ানো হলো। শ্রীহরি-ব্রহ্মা-শিব-নারদাদি মুনিগণ কংসের কারাগারে উপস্থিত হয়ে দেবকীর গর্ভবন্দনা করে যান। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি, বৃষ রাশিতে, বৈশ্য বর্ণে, রোহিণী নক্ষত্রে, বুধবার দুর্যোগপূর্ণ রাতে ১১-১২টার মধ্যে দেবকীর কোল আলো করে জন্ম নেয় শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম-চতুর্ভুজধারী, রূপময় বালক। সে রূপ দেখে বসুদেব-দেবকী ভয়ে রূপ সংবরণ করতে অনুরোধ করলে, মানবরূপ ধারণ করেন। এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, এই সংসার কারাগারসম, সে কারাগারে থেকে মধুময় জীবনধারণ সম্ভব। স্বয়ং ভগবান কারাগারে এসে জীবকে সে শিক্ষাই দান করছেন। ভগবানকে কারাগার থেকে নিয়ে যাবেন বসুদেব! সবই ভগবানের ইচ্ছা। কারাগারের প্রহরীরা ঘুমে মগ্ন। কলকল ধারায় প্রবাহিত যমুনা! উত্তাল তরঙ্গ ভরা যমুনায় পা রাখতেই হাঁটু জলে পার হলেন। পার হয়ে কংস জানার আগেই বসুদেব পুত্রকে নন্দালয়ে রেখে নন্দ মহারাজের সদ্যপ্রসূত কন্যা সন্তান যোগমায়াকে দেবকীর কোলে দিলেন বসুদেব। এ দিকে গকুলে নন্দালয়ে নবজাতক শিশুকে দেখতে এলেন গর্গ মুনি। সেখানে বালকের নামকরণের অনুরোধ জানালে ধ্যানে জ্ঞাত হয়ে তিনি নাম রাখেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’। আর কংস দেবকীর অষ্টম সন্তানের সন্ধান পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে যোগমায়াকে তুলে নিয়ে পাথরে আছাড় মেরে হত্যা করতে উদ্যত হলে শিশুটি আকাশে ঊর্ধ্বগামী হয়ে দৈববাণী করল— ‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’। সে দৈববাণীর কথা শুনে অত্যাচারী কংস গোকুলের সদ্যপ্রসূত সকল শিশুকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কংসের নির্দেশ পালন করতে পূতনা রাক্ষসী সুন্দরী রমণীর বেশে প্রথমেই গিয়ে উপস্থিত হলেন নন্দালয়ে। নন্দালয়ে মা যশোদার কোলে সুন্দর, জ্যোতির্ময় গোপালকে দেখে দুরভিসন্ধি পূতনা গোপালের (শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের নাম) নানা প্রশংসা করে। পুত্র সম্পর্কে পূতনার মিষ্টি বচনে যশোদার মনে কোনো সন্দেহই হলো না। পূতনা আদর করে কৃষ্ণকে তার কোলে তুলে নেয়। আদর আর ভালোবাসার ছলনায় পূতনা নিজের কর্মোদ্ধারে বিষ মাখানো নিজের স্তন গোপালের মুখে দিল। শিশুসুলভ আচরণে গোপাল স্তন পান করছে। এদিকে দুগ্ধপানকালে পূতনারও প্রাণ বের হয়ে যাবার অবস্থা হলো। যন্ত্রণায় ছটফট করে পূতনা গোপালকে সরাতে চাইলো কিন্তু পারল না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পূতনার আসল রাক্ষসী রূপটি প্রকাশ পায়। ঘর থেকে বের হয়ে যায়, তাতেও গোপাল তাকে নিস্তার দেয়নি। পূতনা গোপালকে নিয়ে আকাশ পানে উড়াল দেয়। প্রায় ৬ ক্রোশ বা ১৮ কি.মি. দূরে যায়। স্তন চুষতে চুষতে পূতনা রাক্ষসীকে (অস্ত্র ছাড়া) হত্যা করে গোপাল মাটিতে ফেলে দিল। তখন গোপালের বয়স মাত্র ছয় দিন। ভগবান কারো ঘরে গেলে কি কেউ না করবে! সবাই প্রাণভরে চাইবে প্রতিনিয়ত আসুক। ভগবানের জিনিস ভগবান চুরি করেন বা যা কিছুই করেন, তাতে কারো কিছু বলার আছে কি! নেই। তবু মা যশোদার কাছে চুরির অভিযোগ দেয় কেন? মা যশোদাকে কৃষ্ণের লীলায় অংশীদার করতে অভিযোগ দেয়। দিতে তাদের ভাল লাগে, তাকে নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগে তাই। ভগবানের কথা বলতে বা শোনা সকলেরই ভাল লাগা উচিত। ব্রজের মায়েরা এসে গোপালের চুরির বর্ণনা করছেন, তখন গোপাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছেন! কেন শুনছেন? কারণ ভগবান ভক্ত নারদকে বলেছেন— আমি বৈকুণ্ঠে বা যোগীদের হূদয়ে থাকি না, আমার ভক্তরা যেখানে আমার রূপ-গুণ-লীলা কীর্তন করে আমি সেখানেই থাকি। সুতরাং তার রূপ-গুণ-লীলা কীর্তন করা সকলের পাথেয় হতে পারে কারণ তাতেই মঙ্গল। আবির্ভাবের শুভ দিনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই— কৃষ্ণচর্চায় প্রতিটি উদ্যাপন করি। শ্রীকৃষ্ণের লীলায় রয়েছে ঐশ্বরিক শক্তির প্রকাশ। তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, জগত্পতি। আর ‘কৃষ্ণের যতেক লীলা সর্বোত্তম নরলীলা’। তার প্রতিটি লীলা আমাদেরকে তার প্রতি আরো শ্রদ্ধাসম্পন্ন করে তুলেছে। তার লীলামাধুর্যে অনিষ্টের লেশও নেই, আছে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল করার মধুরস। কে বোঝে তোমার লীলা...’ তুমি যে দিব্য লীলাময়! তার প্রায় প্রতিটি ছবিতে লক্ষ্য করে দেখবেন— মুরলী হাতে ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো থাকেন। কেন? সুন্দর নৃত্য মানুষকে আকৃষ্ট করে, আনন্দ দেয়। আনন্দে, মুরলীর সুরে তিনি সর্বদাই তার দিকে আকর্ষণ করেন বা ডাকেন। সংসারে, কোলাহলে আমরা বধির, তাই শুনি না। ‘শ্রীকৃষ্ণকে’ ঈশ্বর মনে করেনি অসুরেরা এবং বাল্য খেলার সাথীরা। খেলার সাথীরা বন্ধু হিসেবে কাঁধেও চড়েছে, বাত্সল্য রসে মা যশোদা পুত্রজ্ঞানে বাঁধতেও চেয়েছেন, পারেননি। ভগবান কেবল ভক্তের ভক্তি ও ভালবাসাতেই বাঁধা পড়েন। তার প্রতি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা বৃদ্ধি হোক। আর তাকে নিয়ে অসুররাই আজে-বাজে কথা বলে। আজও সমাজে সে-ই অসুর প্রকৃতির লোক বিরাজমান। বর্তমান সমাজেও রয়েছে কিছু কংসের দৌরাত্ম্য। খবরের কাগজগুলো ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা, খুন, মারামারির পসরা সাজিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। দেশপ্রেমিক ও সংস্কৃতিবান ব্যক্তিগণ আসুরিক শক্তির কাছে পরাজিত। তাদের এই অত্যাচারে দেশের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে। যা আমাদেরকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিচ্ছে। এমনই অশান্তির দাবানল থামাতে, আসুরিক ও পাশবিক সকল অপশক্তি দূর করে ‘মনুষ্যত্ব’ অর্জনে ঈশ্বর সকলের সহায় হোন। আর আমরা যেন তার মতো হতে পারি, সমগ্র বসুধাই যেন আপন হয়ে ধরা দেয়-এ হোক সকলের প্রার্থনা। ওঁ শান্তি। লেখক : সরকারি চাকরিজীবী; দপ্তর সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি ই-মেইল :[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন