বুক তাঁর বাংলাদেশের হূদয়

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪৭
তিনি ছিলেন তাঁর কবিতার মতো— মুক্ত, প্রাণবন্ত ও সতত প্রবহমান; যেন হিমালয়ের চূড়া থেকে নেমে আসা এক ঝরনাধারা। ভাবতে অবাক লাগে যে আমৃত্যু এ-মানুষটিকে সাঁতার কাটতে হয়েছে শত সংকীর্ণতা ও কূপমণ্ডুকতার কর্দমাক্ত জলে। অথচ কোনো মলিনতাই স্পর্শ করতে পারেনি তাঁকে। শুভ্র রাজহংসের মতো তাঁর পালক ছিল ঝকঝকে। সচরাচর এমনটি হয় না। কবির সঙ্গে কবিতার, শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর মিল খুঁজতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয় সাধারণ মানুষকে। রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙালি কবিকুলের মধ্যে তাঁর মতো এমন রূপবান কবি অন্তত আমার চোখে পড়েনি। এ রূপময়তার প্রকৃত উত্স তাঁর গাত্রবর্ণের উজ্জ্বলতা কিংবা শিশুর লাবণ্যমণ্ডিত মুখাবয়ব নয়। অন্যরকম এক আলো তাঁকে জড়িয়ে থাকতো সর্বক্ষণ। এ কি প্রতিভার আলো? —এমন প্রশ্ন অন্য অনেকের মতো আমার মনেও জেগেছে। তার যথার্থ উত্তর হয়তো সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তবে আমার মনে হয়েছে যে এ তাঁর অন্তরের আলো। তাঁর ভেতরে সৌন্দর্যের আশ্চর্য এক খনি ছিল। এ হলো অন্তর্নিহিত সেই সৌন্দর্যের আলো। শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য যারা পেয়েছেন তারা তাঁর অন্তরের এ সৌন্দর্যের স্বাদ ও স্বরূপ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত আছেন। ‘ঈসা খাঁর তরবারি’র উল্লেখ আছে তাঁর কবিতায়। কবির ভেতরটা ছিল সেই তরবারির মতোই শানিত। কোনো ধরনের কূপমণ্ডুকতা ও কলুষতার প্রবেশাধিকার ছিল না সেখানে। ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এতোটাই স্বচ্ছ ছিল যে রাজনীতির কোলাহল থেকে শতহাত দূরে থেকেও বারবার তিনি এ অপশক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাঁকে হত্যার চেষ্টাও হয়েছে। এদিক থেকে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এবং আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের সঙ্গে তাঁর নৈকট্য খুঁজে পাওয়া যায়। শামসুর রাহমানের কবিতা সহজবোধ্য নয়। পঞ্চাশের দশকে যখন তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন তখন তাঁর কাব্যভাষা ছিল আরও জটিল। প্রসঙ্গত তাঁর প্রথম চারটি কাব্যগ্রন্থের নাম লক্ষ্য করা যেতে পারে। সেগুলো হলো— ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ ও ‘নিরালোকে দিব্যরথ’। নামের মধ্যেই তাঁর সেই সময়ের জটিল কবিস্বভাবের বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত। এমন কী ব্যক্তি হিসেবেও তিনি ছিলেন লাজুক ও গুটানো স্বভাবের। পরবর্তীকালেও তাঁর কবিতা ও ব্যক্তিত্বের যে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে— এমন কথা বলা যাবে না। এ ধরনের কবিস্বভাব নিয়ে প্রায় অর্ধশতক জুড়ে তিনি কিভাবে বাংলাদেশের মতো স্বল্পশিক্ষিত ও দারিদ্র্যকবলিত একটি দেশে কবিতার মুকুটহীন সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তা এক বিস্ময়ই বটে। শুনতে অবাক লাগতে পারে যে গবেষক হুমায়ুন আজাদ যাঁকে ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’ অভিধা দিয়েছিলেন— বাহ্যত গজদন্তমিনারবাসী সেই শামসুর রাহমানের হূদয়ের সবটাই জুড়ে ছিল মানুষ ও স্বদেশ। আবার বলি, প্রথমে মানুষ, তার পর স্বদেশ। সকলেই জানেন, আমাদের কবিতা মোটা দাগে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত। একটি অন্তর্মুখী— যেখানে শিল্প বা নান্দনিকতাই মুখ্য; অন্যটি বহির্মুখী ও বক্তব্যপ্রধান— যার মূল অবলম্বন হলো রাজনীতি। শেষোক্ত ধারার কবিরা নিজেদের উচ্চকণ্ঠে দেশ ও জনগণের কবি বলে দাবি করতে পছন্দ করেন। শামসুর রাহমানের অবস্থান বরাবরই এর বিপরীত মেরুতে। কিন্তু তাঁর কবিতায় কান পাতলে যতো স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের হূদয়ের স্পন্দন শোনা যাবে— তেমনটি একক কিংবা সম্মিলিতভাবে এ দেশের কবিতায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই যে স্পন্দন— সেটা আকস্মিক নয়, আরোপিত নয়। উদ্দেশ্যের বিন্দুমাত্র প্রণোদনাও যেমন সেখানে নেই, তেমনি শোনা যাবে না শ্লোগানের কানফাটানো গর্জনও। শামসুর রাহমানের একটি কবিতার নাম ‘বুক তার বাংলাদেশের হূদয়’। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদ অকুতোভয় তরুণ নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা— যার বুকে ও পিঠে লেখা ছিল: ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। আমার তো মনে হয়, কবির কোমল বুকটিই ছিল বাংলাদেশের আসল হূদয়— যেখানে বিস্ময়করভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এ জাতির স্বাধীনতা, মুক্তি ও গণতন্ত্রের দীর্ঘ রক্তাক্ত সংগ্রামের প্রতিটি স্পন্দন। কবি নেই, কিন্তু শ্রাবণের জলসিক্ত আকাশের মতো তাঁর হূদয় ছড়িয়ে আছে বাংলার সমগ্র মানচিত্র জুড়ে। কে বলে কবি নেই? লেখক :কবি ও সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন