ইরাকে সংখ্যালঘু ইয়াজিদি, সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া এবং সুন্নি মুসলিম নহে এমন অন্য সমপ্রদায়ভুক্তরা যখন বাস্তুহারা, অবরুদ্ধ এবং চরম মানবিক বিপর্যয়ে তখন জাতিসংঘ ইরাকে তৃতীয় মাত্রার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করিয়াছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ মাত্রার এই জরুরি অবস্থার ঘোষণা তুরস্ক ও ইরাকের সীমান্তসহ অন্যান্য অঞ্চলে উদ্বাস্তু লাখো মানুষকে দ্রুত সাহায্যসামগ্রী পাঠাইবার পথ প্রসারিত করিয়াছে। সন্দেহ নাই যে, এই উদ্যোগে বিপর্যয়ের শিকার বারো লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে বাঁচিবার আশা সঞ্চারিত করিয়াছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বিধান ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন যেই লক্ষ্য ছিল ইরাকের বিপন্ন সমপ্রদায়সমূহের সুরক্ষায় তাহা কতখানি কার্যকর হইবে তাহা এক বিরাট প্রশ্ন। সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে জাতিগত দাঙ্গায় প্রত্যেক বত্সর বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারাইলেও সেখানে সংস্থাটির পদক্ষেপ যে কতটুকু কার্যকর তাহাতো বিশ্ববাসীর অজানা নয়। জাতিগত সহিংসতায় বিপর্যস্ত ঐ দেশসমূহে মানবিক সংকট নিরসনে আজও টেকসই কোনও কৌশল গ্রহণ সম্ভব হয় নাই, বরং প্রত্যেক বত্সর ইহার মাত্রা আরও বাড়িয়া চলিয়াছে আশংকাজনক হারে। বোধগম্য কারণেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিরোধের চাইতেও জটিল ও দুঃসাধ্য। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের মধ্যকার বিভিন্ন বিরোধ নিরসনেও জাতিসংঘ যে খুব সফল তাহা নহে। বিশ্বের যেখানেই শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত জাতিসংঘ অতিসত্বর সেইখানেই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে-ইহাই ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু গত ছয় দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, বিশ্বের বৃহত্ শক্তিগুলির কৌশলগত সহায়তা বা সমর্থন ব্যতীত শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের গৃহীত পদক্ষেপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসার প্রমাণিত। জাতিসংঘের এই দৈন্য যে কোনভাবেই প্রত্যাশিত বা সুখকর নহে তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখেনা।
গত মে মাসে ইরাকের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির ক্ষমতা না ছাড়িবার খামখেয়ালিপনার সুযোগে আইএস(ইসলামিক স্টেট) কর্তৃক দেশটিতে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হইয়াছিল রক্ত দিয়া তাহার প্রতিদান দিয়া চলিয়াছে ইরাকের অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক। ঐ মুহূর্তে নুরি আল-মালিকিকে যথাসময়ে পদত্যাগ করিতে বাধ্য করিবার ক্ষেত্রে জাতিসংঘেরও যে দায়িত্ব ছিল তাহার ছিটেফোঁটাও কি দেখা গিয়াছে? চলমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে দেশটির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা পালনকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া বিবৃতি দিয়াছে বারংবার। অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য পেন্টাগন তিন শতাধিক সামরিক উপদেষ্টা প্রেরণ করিয়াছে, পাঠাইয়াছে জরুরি সাহায্য সামগ্রীও। অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা অনেক রাষ্ট্রও ইতোমধ্যেই উড়োজাহাজ যোগে এই সহায়তাকর্ম পরিচালনা করিয়া চলিয়াছে। গত ১৬ আগস্ট নুরি আল-মালিকি প্রধানমন্ত্রীর পদ হইতে পদত্যাগে সম্মত হইয়াছেন। ইরাকের নূতন প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-ইবাদি সংকট মোকাবিলায় কী নীতি গ্রহণ করেন, তাহাই এখন দেখিবার বিষয়।
