এ কদিকে মূলধনের অভাব, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় - এমন বিপরীত চিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এর সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। তথ্য মতে, রূপালী ব্যাংকের কাছে তারল্যের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের কাছে ২০ হাজার কোটি টাকা, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের কাছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিদিনই এই অলস টাকার পরিমাণ বাড়ছে। অলস টাকার এই পরিমাণ বাংলাদেশের ব্যাংকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে উত্তরোত্তর বিনিয়োগ হওয়া দরকার সেখানে অলস টাকা পড়ে থাকা উদ্বেগেরই বিষয়। অলস টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার একমাত্র কারণ বিনিয়োগ না হওয়া। সমূহ সংঘাত কাটিয়ে নতুন সরকার গঠন এবং সেই সরকারের কয়েক মাস অতিক্রান্ত হলেও শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। কারণ হিসেবে বলা যায়, আপাততভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করলেও অনেকের কাছেই তা মনে হচ্ছে সাময়িক। সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংঘাতের আশংকায় ভাটা পড়েছে বিনিয়োগে। দেশে বিনিয়োগ না হওয়ার প্রধান কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, একে বলা যায় সাময়িক কারণ। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ থাকা অপরিহার্য। সুষ্ঠু বিনিয়োগের জন্য সকল ক্ষেত্রেই কমবেশি ঘাটতি ও অন্তরায় রয়েছে আমাদের দেশে। দেশে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ। ঋণের সুদের পরিমাণ ১৬ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশ। এছাড়াও আছে সার্ভিস চার্জের নামে ২/৩ শতাংশ আদায়।অথচ ভারত সহ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে ব্যাংক মাত্র ৬ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ ঋণ দিচ্ছে। সেখানে ৩ গুণ সুদ দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাবসায়ী - শিল্প উদ্যোক্তরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
এছাড়াও এই চড়া সুদের ঋণও খুব সহজে মেলে না। আছে নানান জটিলতা, ভোগান্তি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের জন্য অদৃশ্য ব্যয়। যদিও শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে কেউ কেউ হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ পেয়ে যায় সহজেই এবং তা আত্মসাতও করে। বিনিয়োগের জন্য ঋণ যেমন সমস্যা, তেমনি নতুন শিল্প স্থাপনেও জটিলতা অনেক। শিল্প উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু হয়নি এখনও। নতুন শিল্প স্থাপনে বা ব্যবসার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬/৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এই অনুমোদন মেলে না সহজেই। নানা জটিলতা, সময়ক্ষেপণ এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য ব্যয়সহ নানা প্রতিকূলতার কারণে যোগ্যতা থাকলেও অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। দেশে নতুন শিল্প গড়ে ওঠা ও বিনিয়োগ না হওয়ার এটিও অন্যতম কারণ। আক্ষেপের বিষয় এই জটিলতা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। উদ্যোক্তা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা দূঢ় করার কার্যকর পদক্ষেপ এখনো গৃহীত হচ্ছে না।
শিল্প বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য বা পূর্বশর্ত জ্বালানি শক্তি। এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতি এবং অনিশ্চয়তায় দেশের শিল্প উত্পাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নতুন নতুন শিল্প নির্মাণ। এতে করে ভাটা পড়ছে বিনিয়োগ। এসব প্রতিকূলতা ওভারকাম করে যারা বিনিয়োগ করছেন, শিল্প গড়ে তুলছেন অবকাঠামোগত অনুন্নয়নের কারণে তারাও সুফল পাচ্ছেন না। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, পরিবহন সমস্যা, অসহনীয় যানজট, বন্দর ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও জটিলতা ইত্যাদির কারণে বিনিয়োগকৃত অর্থের সঠিক মুনাফা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। সব মিলিয়ে দেশে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সব ধরনের উন্নয়ন ও উত্পাদনশীল খাতে। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রমাগত ডলার কিনে চলেছে। ফলে দিন দিন বাড়ছে ডলারের রিজার্ভ। একদিকে ডলার ক্রয়, অন্যদিকে বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য স্ট্যান্ডার্ড রিজার্ভ ৭শ’ বিলিয়ন ডলারের বেশি নয়। বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়া ইতিবাচক হলেও সেই রিজার্ভ কাজে না লাগানোর ফলে অর্থনীতিতে তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দেশে বিনিয়োগ না হওয়ায় ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। ফলে গত এক বছর ধরে বাজারে দেশি-বিদেশি মুদ্রা বাজারে অপ্রয়োজনীয় চাহিদা সৃষ্টি করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিয়েও মুদ্রার অস্বাভাবিক সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এখন তারা বাজার থেকে টাকা তুলে নেয়ার উপকরণগুলো ব্যবহার করছে। রিজার্ভ রেপোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। এই এসব টাকা অলসভাবে রেখে দেয়া হচ্ছে, অথচ এই টাকার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে বছরে সুদ দিতে হচ্ছে ৫ শতাংশেরও বেশি। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় অপচয়।
টাকার সংকট উত্পাদনসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যেমন স্থবির করে দেয়, তেমনি অতিরিক্ত অলস টাকাও দেশের অর্থনীতিতে সংকটের সৃষ্টি করে। বর্তমান মুদ্রানীতিতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তা অতিরিক্ত তারল্যের কারণেই হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তা সাময়িক ফল বয়ে আনতে পারে মাত্র। অলস টাকার স্থায়ী সমাধান করতে হলে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। যেটির সব পদক্ষেপ নেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। দ্রুত ও সঠিক বিনিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরী। পাহাড় পরিমাণ অলস টাকা বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা না গেলে অত্যধিক তারল্যের বিশৃঙ্খলা থেকে বাজারেও বড় ধরনের নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার আশংকা রয়েছে।
ব্যাংকে লাখো কোটি টাকা অলস জমে থাকার মানে কি এই দেশে বিনিয়োগকারী নেই? বিষয়টি তা নয়। দেশে প্রচুর বিনিয়োগ ইচ্ছুক ব্যক্তি আছেন, নতুন শিল্প উদ্যোক্তাও আছেন। সমস্যা অন্যখানে। এখনো অনেক প্রকৃত বিনিয়োগকারী মূলধন পাচ্ছেন না। তারা ঋণের জন্য অনেক ঘুরে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। অন্যদিকে আছে ভিন্ন চিত্র। ভুয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার নামে এক শ্রেণির অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তরা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে নিচ্ছে। কতিপয় ব্যাংক কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীমহল তাদেরকে সুযোগ করে দিচ্ছে। যে দেশে সঠিক বিনিয়োগকারী সময়মতো ঋণ পাবে না, লুটেরা শ্রেণি সহজেই ঋণ পাবে সে দেশের অর্থনীতি সঠিক গতিতে চলার কথা নয়। শিল্প ও বাণিজ্যের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে কৃষি, মত্স্য ও পশু সম্পদ। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে এ খাতে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংকের অলস টাকা সহজেই এসব খাতে বিনিয়োগ করা যায়। আর এই বিনিয়োগ তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত।
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় এক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান রেখে এবারের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবারের মুদ্রানীতিতে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৫.৫% । কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করলে কোনো পদক্ষেপই অলস টাকার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে পারবে না। বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির কথা আমরা সব সময়ই শুনি। কিন্তু সত্যিকারের বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি এখনো। তার প্রমাণ ব্যাংকে বিশাল অংকের অলস টাকা। দেশে বিনিয়োগের জন্য প্রথমেই যা করতে হবে তা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতার আশংকা দূর করা। এটি সরকারকেই করতে হবে। দ্বিতীয়ত ব্যাংক ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটের বেশি না হওয়া, তৃতীয়ত প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের গুরুত্ব দেয়া এবং দ্রুত সময়ে তাদের হাতে মূলধন পৌঁছে দেয়া। এছাড়াও শিল্প ও ব্যবসায় ক্ষেত্রে বিরাজমান প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে অন্যান্য দেশের মতো ওয়ান স্টপ সাভির্স অতিদ্রুত চালু করা, পর্যাপ্ত জ্বালানি শক্তির ব্যবস্থা করা এবং অবকাঠামোগত ভিত্তিকে উন্নত করা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্যাংকে এভাবে অলস টাকা পড়ে থাকা কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা চাই অতিদ্রুত অলস টাকার প্রকৃত বিনিয়োগ।
লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]
