অজানাকে জানার ক্ষুধা বিজ্ঞানীদের চিরন্তন। অজানা রহস্যকে জানার শখ থাকে তাদের। কিন্তু শখের কি একটা সীমা থাকা উচিত নয়? সব শখ কি পূরণ হবার? ইউরোপের একদল বিজ্ঞানী এবার বুঝিয়ে দিলেন, মনে শখ জাগলে তা একদিন না একদিন পূরণ হয়। তা না হলে ধূমকেতুর পিছু নিয়ে তাকে ধরে ফেলা-এ যে কল্পনারও অতীত!
কল্পনা বাস্তবে রূপ দিয়ে ছেড়েছে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির মহাকাশযান রোসেটা। এই প্রথম কোনও যান পৌঁছে গেল একটি ধূমকেতুর কাছে। ধূমকেতুটির নাম ৬৭পি/ চুরিউমোভ-গেরাসিমেঙ্কো। এটি যাতে আর কাছ-ছাড়া না হয় সেলক্ষ্যে তাকে পরিক্রমণ করতেও শুরু করেছে। ২০০৪ সালের মার্চ মাসে এই ধূমকেতুকে লক্ষ্য করে ফ্রেঞ্চ গায়ানার কুরু উেক্ষপণকেন্দ্র থেকে মহাকাশে পাঠান বিজ্ঞানীরা।
গত ৬ আগস্ট প্যারিসের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩১ মিনিট। ইল দ্য ফ্রাঁসে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ) সদর দপ্তর কেঁপে উঠল প্রবল চিত্কারে। হ্যাঁ, ফের ইতিহাস গড়েছে প্রযুক্তি। ৬৪০ কোটি কিলোমিটার দূরে একটি ধূমকেতুর কাছে পৌঁছানোর আশায় ১০ বছর ৫ মাস ৪ দিন আগে যে বিশাল জুয়া খেলেছিলেন বিজ্ঞানীরা, তা মুখ রেখেছে তাদের। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের এমন দুঃসাহসিক প্রকল্পে এর আগে কখনও হাত দেয়নি ইএসএ। রোসেটা অভিযানের ওপর তাই নির্ভর করছিল অনেক কিছুই।
১৯৬৯ সালে দুই রুশ জ্যোতির্বিদ ক্লিম চুরিউমোভ ও সেতলানা গেরাসিমেঙ্কো একসঙ্গে খুঁজে পেয়েছিলেন মহাকাশে ভ্রাম্যমাণ এক ধূমকেতুকে। সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার, সর্বাধিক প্রস্থ ৩ কিলোমিটার। অনেকটা জুতোর আকৃতির এই পাথুরে টুকরোর নাম দেয়া হয় ৬৭পি/ চুরিউমোভ-গেরাসিমেঙ্কো। সংক্ষেপে ৬৭পি/ সি-জি। গ্রহাণুপুঞ্জের ওপারে, পৃথিবী ও বৃহস্পতির মাঝখানে থেকে সাড়ে ছয় বছরে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে এই ধূমকেতু। পৃথিবী থেকে এর গড় দূরত্ব ৬৪০ কোটি কিলোমিটার।
সৌরজগতের এক একটি গ্রহে বহির্বিশ্ব থেকে কীভাবে জলীয় বাষ্প এসেছিল, তা নিয়ে তত্ত্বের কমতি নেই। তবে, ধূমকেতু বা উল্কার সঙ্গে পানির অণু পৃথিবীতে এসেছিল এই তত্ত্ব খুবই জনপ্রিয়। এ ছাড়াও সৌরজগত্ ও বিশ্বের উত্পত্তির চাবিকাঠি নাকি ধূমকেতুদের অন্দরেই লুকানো আছে, এমন ধারণাও এতদিন পোষণ করে এসেছেন বিজ্ঞানীরা। তত্ত্বগত জ্ঞান দিয়ে আর চলছিল না। তাই, গোটাকতক ধূমকেতু ‘ধরে আনার’ দুঃসাহসিক পরিকল্পনায় হাত দিয়েছিলেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল ৬৭পি/ সি-জি’র বদলে ৪৬পি/ উইরট্যানেন নামের তুলনামূলকভাবে ছোট একটি ধূমকেতুকে ধাওয়া করবে রোসেটা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ঝুঁকি না নিয়ে বড়সড় ৬৭পি/ সি-জি-কেই বেছে নেন গবেষণার জন্য।
রোসেটা প্রকল্পের ফ্লাইট ডিরেক্টর আন্দ্রিয়া আকোমাজো জানিয়েছেন, আরো ১৭ মাস এভাবেই ধূমকেতুটির চারপাশে চক্কর কাটতে থাকবে ১০ ফুট দীর্ঘ এই রোসেটা। দু’পাশের লম্বা ডানার মতো বিস্তৃত সোলার প্যানেলের মতো অংশ থেকে এই সময় ক্রমাগত পৃথিবীতে তথ্য পাঠাতে থাকবে এটি। মাঝের বিপুল দূরত্ব পার করে সেই তথ্য আমাদের কাছে আসতে সময় লাগবে ২২ মিনিট।
১৭ মাসের এই সময়ে অন্তত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালাবে রোসেটা। এর পরই শুরু হবে এর পিঠের উপর অবতরণের কাজ। এর জন্য রোসেটার সঙ্গেই বেঁধে দেয়া হয়েছে ফিলি নামের একটি বিশেষ যান। ধূমকেতুর ঘাড়ে চড়ে বসতে পারলে ইতিহাস গড়বে ফিলিও। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ঘণ্টায় ৫৫ হাজার কিলোমিটার বেগে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে ৬৭পি। সেই বেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রোসেটাও ঘুরতে থাকবে ধূমকেতুর গায়ে গা লাগিয়ে; মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে থেকে। ইএসএ-র এই প্রয়াস মহাকাশ বিজ্ঞানকে এক ধাক্কায় এগিয়ে দিল অনেকখানি।
