ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোগে ভাটা পড়িয়াছে। বেসরকারি বাসের সংখ্যা যেমন কমিয়াছে, তেমনি সেবার মানেও অধোগতি হইয়াছে। ফলে বাড়িয়াছে জনদুর্ভোগ। বিভিন্ন স্থানে বাসের জন্য অফিস বা ঘরমুখী যাত্রীদের অপেক্ষার প্রহর দিন দিন দীর্ঘতর হইতেছে। বাসের সংখ্যা কম থাকায় গাদাগাদি করিয়া যাইতে হইতেছে অধিকাংশ যাত্রীকে। যেইসব বাস আগে সিটিং সার্ভিসে ছিল, সেইসবের বেশিরভাগই এখন পরিণত হইয়াছে লোকাল বাসে। সহযোগী একটি দৈনিকের খবরে প্রকাশ, গত পাঁচ বত্সরে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ৫১টি পরিবহন সার্ভিস বন্ধ হইয়া গিয়াছে। বন্ধ হইয়াছে বেশিরভাগ কাউন্টার সার্ভিস। এইসব পরিবহন কোম্পানি একসময় নগরবাসীদের উন্নত সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়া যাত্রা শুরু করিয়াছিল। প্রথম দিকে তাহাদের সার্ভিসে আন্তরিকতার ছাপ থাকিলেও ধীরে ধীরে সেবার মান পড়িয়া যায়। বর্তমানে সমস্যা হইল, যেইসব কোম্পানি এখনও টিকিয়া আছে, তাহারা উন্নত সেবা ধরিয়া রাখিতে না পারিলেও নিয়মিত বাসভাড়া বৃদ্ধি করিতে কসুর করিতেছে না। এইজন্যও বাসযাত্রীদের রহিয়াছে ক্ষোভ। এই ক্ষোভ নিরসনের কোন লক্ষণও দেখা যাইতেছে না।
দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, কয়েক বত্সর ধরিয়া রাজধানীর গণপরিবহনে বেসরকারি পর্যায়ে বড় ধরনের নূতন বিনিয়োগ বলিতে কিছু নাই বলিলেই চলে। মহানগরবাসীর প্রতিদিনের বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগ দূর করিতে এই বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্ব সর্বাগ্রে কাটাইয়া উঠিতে হইবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র হইতে জানা যায়, ঢাকার রাস্তায় আগে প্রায় সাত হাজার বাস চলিলেও এখন চলিতেছে সাড়ে তিন হাজার। যদিও খাতা-কলমে পাঁচ হাজার বাস চলিবার তথ্য দেওয়া হইয়াছে। ইহার বিপরীতে যোগাযোগমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী গত তিন-চার বত্সরে রাজধানীতে বিআরটিসির এক হাজার বাস যুক্ত হইয়াছে। কিন্তু সরকারি এই পরিবহন ব্যবস্থা নিয়াও জনগণের মধ্যে আছে অসন্তোষ। কোথাও কোথাও ইহা অনিয়মিতভাবে চলিতেছে। আবার কিছু কিছু বাস এক বত্সর না চলিতেই বন্ধ হইয়া যাইতেছে বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। যেমন চীন হইতে আমদানি করা কিছু বাসের ভাগ্যে এমনটিই ঘটিয়াছে। মতিঝিল-ফার্মগেট-উত্তরা, সদরঘাট-মতিঝিল-কুড়িল-উত্তরা, মিরপুর-ফার্মগেট-গুলিস্তান, গাবতলি-সায়েদাবাদ-গুলিস্তান-সদরঘাট, নিউমার্কেট-গুলশান-বাড্ডা, গুলিস্তান-মতিঝিল-মগবাজার-উত্তরা-গাজীপুর প্রভৃতি রুটে আজ অনেক পরিচিত ও জনপ্রিয় বাসের দেখা পাওয়া যায় না। এইখানে কোম্পানিগুলির নাম নাইবা উল্লেখ করা হইল। কিন্তু ঘটনা যে সত্য ও বাস্তব তাহা তো অস্বীকার করা যায় না। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মতে, তীব্র যানজট, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, পার্কিং বে’র অভাব, ভাল চালকের দৈন্যদশা, প্রায়শ কাউন্টারে হামলা ও লুটপাট, কাউন্টার স্থাপনে সিটি করপোরেশনের আপত্তি ইত্যাদি কারণে ও লোকসানের মুখে পড়িয়া একের পর এক বাস সার্ভিস বন্ধ হইয়া গিয়াছে।
অন্যদিকে লক্কর-ঝক্কর মার্কা পুরাতন বাস রাজধানী হইতে উঠাইয়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত ও নূতন বাসের বাধ্যবাধকতা আরোপ করানোর কারণেও বাসের সংখ্যা কমিয়া গিয়াছে বলিয়া জানা যায়। সরকারের এইরূপ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হইলেও রাস্তায় নূতন বাস না নামায় যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে। মহানগরবাসীর এই দুর্ভোগ লাঘবে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এমতাবস্থায় জনগণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করিতে হয় সরকারি বিআরটিসি বাস দিয়া ঢাকা শহর ভরিয়া দিতে হইবে, নতুবা বেসরকারি উদ্যোগকে আরও উত্সাহিত করিতে হইবে। প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের নগরবাসীর সুবিধার্থে ঢাকার গণপরিবহনকে ঢালিয়া সাজাইতে হইবে নূতন আঙ্গিকে ও পরিকল্পিতভাবে ।
