উত্তম উত্পাদন কৌশল ও মানসম্মত ঔষধ

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫২
২০১২ সালে সংসদীয় কমিটির পরিদর্শক দল সমগ্র দেশের ঔষধ কোম্পানিগুলিতে পরিদর্শন চালাইয়া ৭৩টি কোম্পানিকে ত্রুটিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছিল এবং এইগুলির মধ্য হইতে মান বিবেচনা করিয়া ২৯টিকে চিহ্নিত করিয়াছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে। কিন্তু পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, সেই ২৯টি কোম্পানির উত্পাদিত ঔষধ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এখনও নির্বিঘ্নে সেইগুলির বিপণন চলিতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘উত্তম উত্পাদন কৌশল’ (জিএমপি) লংঘন করিয়া এই কোম্পানিগুলি ঔষধ তৈরি ও বিপণন করিতেছে। এই সকল ঔষধ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিদর্শন চালাইয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রায় দুই বত্সর আগেই এই কোম্পানিগুলি বন্ধের সুপারিশ করিয়াছিল। কিন্তু অদ্যাবধি তাহা বাস্তবায়িত হয় নাই। এইগুলির মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়া এখন পর্যন্ত কার্যক্রম চালু রাখিয়াছে; বাকিগুলিও বসিয়া নাই, নানা ফন্দিফিকির করিয়া তাহাদের উত্পাদন ও বিপণন অব্যাহত রাখিয়াছে । তথাপি ইহা গৌরবের বিষয় যে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রায় একশত দেশে ঔষধ রপ্তানি করিতেছে। মান বজায় থাকিতেছে বলিয়াই এইসকল ঔষধ রপ্তানি হইতেছে। প্রথম সারির কোম্পানিগুলির ঔষধের গুণগত মান এবং সেইসূত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম আছে বলিয়াই বিশ্ববাজারে তাহারা ঢুকিতে পারিয়াছে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখিতেছে। আমরা এইসব স্বনামধন্য কোম্পানির কথা বলিতেছি না। আমরা বলিতেছি সেই সকল কোম্পানির কথা, যাহারা অতিমুনাফার লোভে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়া সাধারণ চিকিত্সাপ্রার্থীদের কেবল ঠকাইতেছেই না, তাহাদের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করিয়া তুলিতেছে। সারাদেশে ইহাদের অসংখ্য মেডিক্যাল রেপ্রিজেন্টেটিভ নিয়োগ দেওয়া থাকে। ঔষধের দোকানগুলি, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলির বিপুল পরিমাণ ঔষধ চাহিদা মিটাইতে তাহারা ভালো কোম্পানিগুলির তুলনায় স্বল্পমূল্যে ঔষধ বিক্রয় করে এবং নানা রকমের সুযোগ-সুবিধা দেয়। অসাধু ডাক্তারগণকেও তাহাদের কোম্পানির ঔষধের নাম প্রেসক্রিপশনে লিখিয়া দিবার বিনিময়ে নিয়মিত আর্থিক এবং অন্যান্য সুবিধা দেয়। ফলে, পুরা চিকিত্সাক্ষেত্র জুড়িয়াই জীবন রক্ষাকারী ঔষধ নিয়া একটা অসাধু চক্র গড়িয়া উঠিয়াছে-আর চিকিত্সাপ্রার্থীরা হইতেছে তাহার নির্মম শিকার। ডব্লিউএইচও’র ‘উত্তম উত্পাদন কৌশল’ পাশ কাটাইয়া ঔষধ উত্পাদন করিলে সেইগুলি অবশ্যই নিম্নমানের হইবে বলিয়াই সাধারণ জ্ঞানে বলে। এই সকল ভেজাল ও নিম্নমানের ঝুঁকিপূর্ণ ঔষধ সেবন করিলে রোগ না সারিয়া উল্টা বাড়িয়া যাইবার এবং নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। আর, মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্যান্সার, হূদরোগ কিংবা স্ট্রোকও হইতে পারে; এমনকি হঠাত্ কিডনি বিকল হইয়া রোগী মৃত্যু ঘটিবারও আশংকা থাকে। আমরা হয়তো ভুলিয়াই গিয়াছি, নব্বইয়ের দশকে ভেজাল ও বিষাক্ত প্যারাসিটামল সেবনের ফলে অনেক শিশু কিডনি বিকল হইয়া মারা গিয়াছিল। নিয়মিতভাবে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন মানিয়া কিংবা ডিসপেনসারির পরামর্শে এইসকল নিম্নমানের কিংবা নকল-ভেজাল ঔষধ সেবন করিয়া আমরা নিজেদের অজান্তেই শরীরে কত প্রকারের জটিলতা তৈরি করিয়া ফেলিতেছি, এক রোগ সারাইতে গিয়া আর পাঁচটা বাধাইয়া বসিতেছি, তাহা আমরা হয়তো জানিতেও পারিতেছি না। সেহেতু, নিদিষ্ট মান অর্জনে ব্যর্থ কোম্পানিগুলি, নকল ও ভেজাল ঔষধ তৈরির কারখানাগুলি নিয়া কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা অনুচিত। নির্দিষ্ট মান বজাইয়া রাখিতে অক্ষম ঔষধ কোম্পানিগুলি বন্ধ করিয়া দিতে আশু পদক্ষেপ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। লাইসেন্স বাতিল বা উত্পাদন বন্ধ রাখিবার ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকিলেও অচিরেই তাহা সংশোধন করিয়া যুগোপযোগী করা দরকার। কিন্তু কোনোভাবেই কিছু মানহীন কোম্পানি ও নকল-ভেজাল কারখানা মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষধ শিল্পকে জীবন বিপন্ন করিবার ব্যবসায় পরিণত করিবে- তাহা আমরা কোনভাবেই হইতে দিতে পারি না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন