‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর পাঁচ বছর পূর্তি হয়ে গেছে। সুতরাং ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’কে নিয়ে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। প্রথমে দেখে নেয়া যাক, আমরা কতদূর এগিয়ে যেতে পেরেছি। আর ডিজিটাল পৃথিবীর কোন অবস্থানে আছি আমরা। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন কর্তৃক আইডিআই পরিচালিত জরিপে ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৩৫তম—যা ২০১১ সালে ছিল ১৩৯তম। এই র্যাঙ্কিং এ ভুটান (১১৮), মালদ্বীপ (৭৩), মিয়ানমারের (১৩৪) অবস্থান আমাদের উপরে। আবার ১৪৪টি দেশের মধ্যে পরিচালিত দ্য নেটওয়ার্কড রিডনেস ইনডেক্স (এনআরআই)-এর জরিপে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১১৯ যেটা ২০১৩ সালে ছিল ১১৪। আইডিআই-এর জরিপে আমরা কিছুটা উন্নতি করলেও এনআরআই-এর জরিপে আমরা পিছিয়ে গেছি। আবার জাতিসংঘ পরিচালিত ই-গভর্মেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (ইজিডিআই)-এর জরিপে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪৮তম—যা ২০১২ সালে ছিল ১৫০তম, ২০১০-এ ছিল ১৩৪ম।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি, এসএমএস ও অনলাইনের মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ সরকারের একটি বড় সফলতা। আমার জানা মতে, বিভিন্ন সেক্টরে এই ধরনের ই-গভর্নেন্সের কাজ চলছে। সেক্ষেত্রে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরছি। হয়তো এই প্রস্তাবনাগুলো নীতি-নির্ধারক মহলের নীতি গ্রহণে সহায়তা করতে পারে।
প্রস্তাবনাসমূহ :
১. পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের মতো ইন্টারনেট সেবাকে ডেইলি ইউটিলিটির মর্যাদা দিতে হবে এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য তা নিশ্চিত করতে হবে; ২. যুক্তরাষ্ট্রের ই-গভর্নেন্স অ্যাক্ট, ২০০২ এর মতো আমাদের দেশেও ই-গভর্নেন্সের আলাদা আইন করতে হবে; ৩. সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নিজস্ব ই-গভর্নেন্স পারফরম্যান্স বেঞ্চমার্ক থাকতে হবে যেটা যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন ও ফ্রান্সে রয়েছে; ৪. জনগণ যেন ই-গভর্নেন্স এর প্রতি উত্সাহী হয় সেজন্য অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম চালু করতে হবে; ৫. পিপিপি’র মাধ্যমে ই-গভর্নেন্সকে শক্তিশালী করা যেতে পারে যেটা ভারতে ইউনাইটেড টেলিকমের সাথে রয়েছে; ৬. ভয়েস কল, ইন্টারনেট ও এসএমএস-এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্যাকেজের পরিবর্তে ফ্ল্যাট রেট কমিয়ে কৃষকের ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে; ৭. ফিক্সড ফোন, পিএসটিএনকি কার্যকরী করতে হবে; ৮. বিটিসিএলকে মোবাইল কোম্পানির মতো গতিশীল করতে হবে; ৯. গ্রাহকসেবা বাড়িয়ে এবং মূল্য কমিয়ে জনগণকে ফিক্সড ফোন এবং বিটিসিএল-এর ব্যান্ডউইথ ব্যবহারে উত্সাহী করতে হবে; ৮. সকল ক্ষেত্রে ব্যান্ডউইথের মূল্য কমাতে হবে। সরকার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ ও সামাজিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে টোল ফ্রি টেলিফোন ও ফ্রি এসএমএস সার্ভিস চালু করতে হবে; ৯. দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে হবে; ১০. প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে; ১১. উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে হবে; ১২. পুলিশের এএসআই থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত কম্পিউটার ও ইন্টারনেট শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে যেন ক্রাইম অ্যানালাইসিস এন্ড ম্যানেজমেন্টে তারা আরো গতিশীল ও যুগোপযোগী হয়ে ওঠে; ১৩. আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকে অনলাইনে নিয়ে আসতে হবে যেন বিচারপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার না হয়; ১৪. স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অনলাইনের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে; ১৫. ট্রাফিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ‘ইন্টিলিজেন্ট টান্সপোর্টেশন সিস্টেমস (আইটিএস)-এর আওতায় নিয়ে আসতে হবে; ১৬. ভারত ও ফিলিপাইনের মতো কল সেন্টার ও সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আইসিটি ও ইংরেজি শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ; ১৭. যুক্তরাষ্ট্রের মতো জাতীয় আর্কাইভ এবং অনলাইন রেকর্ড সেন্টার গড়ে তুলতে হবে; ১৮. যুক্তরাষ্ট্রের ফেমা’র মতো একটি সেন্ট্রাল অনলাইন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে; ১৯. আইসিটি খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে; ২০. ই-গভর্নেন্সের আওতাভুক্ত সিটিজেন ডাটাবেজ, স্পর্শকাতর তথ্যসমূহের সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে; ২১. গার্মেন্টস শ্রমিক এবং কৃষকের জন্য আলাদা কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে; ২২. আরব আমিরাতের মতো জাতীয় পরিচয়পত্রের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে—যেমন, ব্যাংক লেনদেন, অনলাইনে পেমেন্ট করা ইত্যাদি। অর্থাত্ জাতীয় পরিচয়পত্রটি যেন স্মার্টকার্ডের মতো ব্যবহূত হতে পারে; ২৩. সমপ্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, স্পেন এবং ঘানাতে বেকারত্বের অন্যতম একটা কারণ হলো, চাকরির সুযোগ ও করণীয় সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব। সেক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় জব পোর্টাল গড়ে তুলতে হবে যেখানে দেশি, বিদেশি চাকরি সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত থাকবে; ২৪. বিদেশে গমনেচ্ছু দক্ষ, অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য আলাদা পোর্টাল থাকবে যেন তারা সহজেই তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারে; ২৫. ই-গভর্নেন্সের আওতায় রিয়েল টাইম টু ওয়ে কমিউনিকেশনের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনাকে আরো গতিশীল ও কার্যকরী করা যেতে পারে যেটা ভারতের ই-গভর্নেন্স সিস্টেমে চালু রয়েছে; ২৬. পাকিস্তানের মতো দুর্গম এলাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারে ই-এসএমএস প্রজেক্ট চালু করা যেতে পারে; ২৭. স্লোভেনিয়ার ‘আই সাজেস্ট টু দ্য গভর্মেন্ট’-এর মতো প্রজেক্টের মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে; ২৮. ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে ই-গভর্নেন্সের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে; ২৯. ‘ই-ট্যুরিজম’ এর মাধ্যমে ই-টিকেটিং, জিপিএস, অনলাইন হোটেল বুকিং, রিয়েল টাইম ওয়েদার ফোরকাস্টিং, অনলাইন ভার্চুয়াল ট্যুর, ভার্চুয়াল আর্টিনারী ইত্যাদির মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে আরো প্রসারিত ও বিকশিত করতে হবে।
শেষ করার আগে শ্রীলংকার উদাহরণটি দিতে চাই। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ শ্রীলংকা। ২০১২ সালে ইজিডিআই র্যাঙ্কিং এ শ্রীলংকার অবস্থান ছিলো ১১৫। আর ২০১৪ সালে তার র্যাঙ্কিং এসে দাঁড়িয়েছে ৭৪-এ। কি বিস্ময়কর উন্নতি! বর্তমানে তাদের মোবাইল ব্যবহারের হার ১০০% এর বেশি। শ্রীলংকান সরকার চালু করেছে ‘ওয়ান ফর অল’ সার্ভিস। অর্থাত্ যার একটি মোবাইল সেট আছে সে যেন পুরো সরকারী ব্যবস্থাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরছে। স্বাস্থ্যসেবা, চাকরির তথ্য, পরীক্ষার রেজাল্ট, আবহাওয়া পরিস্থিতি, বিমানের সময়সূচি, সরকারি বিভিন্ন তথ্য ইত্যাদি সবই যেন পেয়ে যাচ্ছে। একজন আমলা থেকে গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক সবাই যেন সরকারের এক একটি অংশ। একটি মোবাইল সেট যার কাছে আছে পুরো রাষ্ট্র যেন তাকে ছায়া দিচ্ছে। আমরা কি পাবো ২০২১ সালের মধ্যে এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা?
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক লেখক
[email protected]
