একদিকে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা, অন্যদিকে মিয়ানমার হইতে বিতাড়িত মানুষের জন্য আশ্রয়ণ—কক্সবাজার যেন পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে। ‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’র মতো কক্সবাজার তার সৌন্দর্যের কারণে তোপের মুখে পড়িয়াছে ভূমি দস্যুদের। ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, কক্সবাজার শহর ও শহরতলীর পাহাড়ি এলাকা দখল করিয়া পাহাড় কাটিয়া বসতি গড়িতেছে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা। বর্ষাকালের টানা বর্ষণের সময় প্রশাসনের নজরদারি তুলনামূলকভাবে কম থাকে বলিয়া গত এক মাসে কক্সবাজার শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাঁচ শতাধিক অবৈধ বসতবাড়ি গড়িয়া তোলা হইয়াছে। তাহাদের দেখাদেখি স্থানীয়রাও পাহাড় কাটিতে উদ্বুদ্ধ হইতেছে। জমি দখল ও বসতি গড়িবার প্রতিযোগিতায় তাহারাও নাম লেখাইয়াছে।
পাহাড় কাটিয়া বসতি নির্মাণের এই প্রতিযোগিতা চলিতেছে কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়িয়া। আর এই কাজটি বর্ষাকালে করিবার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এই কারণে যে, বৃষ্টির সময় পাহাড়ে উঠিবার হাঁটা রাস্তা পিচ্ছিল থাকে বিধায় প্রশাসনের কেহ ঘটনাস্থলে আসিতে পারেন না। অপার সম্ভাবনার পর্যটন শহর হিসাবে কক্সবাজারে জায়গা-জমির দাম দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী হইতেছে। স্বভাবতই ভূমিদস্যুরা মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে সরকারি পাহাড় দখলে। এমন ঘটনায় পত্রিকান্তরে প্রকাশ হইয়াছে যে, পাহাড় কাটিয়া বসতভিটা তৈরির উপযোগী করিবার পর একই জমি একাধিকবার বিক্রয় করা হইতেছে। অর্থাত্ একটি অবৈধ কাজের হাত ধরিয়া যতপ্রকারে সম্ভব আরও অবৈধ কাজ চলিতেছে। তাহাতে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিবাদ বিসংবাদও বৃদ্ধি পাইতেছে। অবৈধভাবে পাহাড় কর্তনকৃত জমিতে প্লট তৈরি করিয়া তাহা বিক্রির সহিত জড়িত আছে বিভিন্ন ডেভেলপার কোমপানি, ব্যবসায়ী ও সরকারি দলের উচ্চ পর্যায়ের কিছু নেতা। এইভাবে তাহারা রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতাইয়া লইতেছে। অভিযোগ রহিয়াছে যে, এই টাকাও বহু ক্ষেত্রেই ব্যয় হইতেছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, মদ, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের ব্যবসার টাকা ও পাহাড় কর্তনের মুনাফা উভয় খাতে ঘুরাইয়া ফিরাইয়া ব্যবহার করা হইতেছে। অর্থাত্ এক অপরাধের দোসর হইতেছে আরেকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
কেবল কক্সবাজার এলাকাতেই নয়, অন্যান্য পাহাড়ি অঞ্চলেও এই প্রবণতা রহিয়াছে। সুতরাং পাহাড় কর্তনের ক্ষতি শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশেরই হয় না। তাহা সার্বিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব রাখিয়া যায়। আর সার্বিকভাবে পরিবেশের ক্ষতির হিসাব করিলে তাহাকে কোনো তুলাদণ্ডেই পরিমাপ করা সম্ভব হইবে না। এই ক্ষতি তাত্ক্ষণিক হইতে সুদূরপ্রসারী অবধি। পাহাড় কাটা মাটি আসিয়া পৌরসভার নালা-নর্দমা ভরাট হইয়া বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করিতেছে। হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগের শিকার হইতেছে। এই জাতীয় তাত্ক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি সুদূরপ্রসারী ক্ষতির সম্ভাব্য চিত্র আমাদের কপালে ভাঁজ ফেলিয়া দেয়। পাহাড় কর্তনের সম্পূরকে চলে বৃক্ষ নিধনও। কক্সবাজারে বিভিন্ন নদী, শাখা নদী, খাল ও ছড়ার দুইপাড় হইতে নানা প্রজাতির বৃক্ষ, গুল্ম, লতা জাতীয় উদ্ভিদ ধ্বংস হয় পাহাড় কর্তনের ফলে। তাহাছাড়া বনাঞ্চল ধ্বংস হইয়া পাহাড় মাটি ধরিয়া রাখিবার ক্ষমতা হারাইতেছে। ফলে হালকা, মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিপাত হইলেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা ও নিম্নাঞ্চলের লোকজনকে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাইতে হয়। ইহাতে ওই এলাকা বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, সুনামি, ভূমিধস ও ভূমিকমপপ্রবণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়। সুতরাং পাহাড় কর্তন রুখিবার ব্যবস্থা ভিন্ন এই বিপর্যয় মোকাবিলার অন্য কোনো পথ নাই।
