ফেনীর সোনাগাজীর একটি কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছয়শত শিক্ষার্থীর নিকট হইতে ‘মিলাদ ও ছাত্রকল্যাণ ফান্ড’ বাবদ একশত করিয়া টাকা আদায় করা হয়। এই টাকার জন্য সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের একাংশ অধ্যক্ষকে চাপ দিয়া আসিতেছিল। সমপ্রতি তাহারা এই অর্থ না পাইয়া কলেজের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ করিয়া দেয়। ক্লাসে ঢুকিয়া শিক্ষার্থীদের বাহির করিয়া দেয়। অধ্যক্ষের মতে, ছাত্রকল্যাণ ফান্ডের টাকা আগেই ছাত্রনেতাদের দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু যাহারা ভাগ পান নাই, তাহারাই এখন এইসব তাণ্ডব করিয়াছেন। ছাত্রকল্যাণ ফান্ডের টাকা কোন খাতে ও কিভাবে ব্যবহার করা হইবে, তাহার নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন রহিয়াছে। সাধারণত এই অর্থ দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্তি, বই প্রদান, যথাসময়ে বেতন বা পরীক্ষার ফি দিতে না পারার ক্ষেত্রে গরীব ও মেধাবি শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় হইয়া থাকে। ইহা কোনমতেই কোন ছাত্রনেতার ব্যক্তিগত কাজে বা মর্জিমাফিক ব্যবহূত হইতে পারে না। এমনকি ইহা কোন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহূত হইবার কথা নহে। কলেজ কর্তৃপক্ষও এই টাকা অন্য খাতে খরচ করিতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিকট হইতে আদায়কৃত অর্থ বহু ক্ষেত্রে অসদ্ব্যবহার করা হইলেও তাহা যেন দেখিবার কেহ নাই।
স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট হইতে যেইসব খাতের কথা বলিয়া টাকা আদায় করা হয়, তাহার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। এই অর্থের নয়ছয় মানিয়া নেওয়া যায় না কোনমতেই। এই অর্থ ব্যবহারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিচয় দিতে হইবে। এই ফান্ড যে শুধু শিক্ষার্থীদের নিকট হইতে আদায় করা হয় তাহা নহে, অনেক দেশে এলামনাই সদস্যদের নিকট হইতেও এই বাবদ অর্থ আদায় করা হইয়া থাকে। শিক্ষার্থীদের উপকার হয় এমন কর্মসূচী যেমন—ক্যাম্পাসে টিউবওয়েল স্থাপন, কোন ছাত্র-ছাত্রী কোন দুর্ঘটনায় হতাহত হইলে সহায়তা প্রদান, কাহারও দীর্ঘময়োদি চিকিত্সার জন্য অর্থ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এই অর্থ ব্যবহার করা যায়। আবার কেহ কাহারও জীবন রক্ষা করিলে বা জনসম্পদ রক্ষা করিলে তাহাকে এই ফান্ড হইতে সাহসিকতার প্রমাণ স্বরূপ পুরস্কৃত করা যাইতে পারে। কোন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ের কোন খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখিলে তাহাকেও এই তহবিল হইতে পুরস্কার দেওয়া যায়। এই ফান্ড ব্যবহার করিয়া ছাত্রদের নিরাপত্তার জন্য ইন্সুরেন্স খোলা যায় বা বীমা করা যায়। যাহারা স্কুলের বাহিরে আঞ্চলিক বা জাতীয় পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফল অর্জন করে, তাহাদেরও এই ফান্ডের অর্থ দ্বারা পুরস্কৃত করা যায়।
‘স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড’ যেমন রহিয়াছে, তেমনি ইহার বিপরীতে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রহিয়াছে টিচারস বেনিফিট ফান্ড। শিক্ষকরা এই ফান্ড হইতে উপকৃত হন। এই ফান্ড ব্যবহারে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু ছাত্রকল্যাণ তহবিলের অর্থ তছরুপ করিবার জন্য যেন অনেকেই এক পায়ে দাঁড়াইয়া থাকে। ছাত্রনেতারা যে ফান্ড ব্যবহারের অধিকার রাখেন তাহা হইল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ফান্ড। অবশ্য এই ফান্ড হইতে নির্বাচিত বা মনোনীত ছাত্রনেতারাই কেবল নিয়ম অনুযায়ী অর্থ খরচ করিতে পারেন। কিন্তু প্রায় সকল সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজকাল ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকায় এক্ষেত্রে কোন নিয়ম-শৃঙ্খলা কাজ করিতেছে না। এই ফান্ড ব্যবহারে নৈরাজ্য সৃষ্টির মূল কারণ ইহাই। আবার সব জায়গায় হাত দেওয়া ও সবখানে নাক গলাইবার যে খারাপ সংস্কৃতি দেশব্যাপী গড়িয়া উঠিয়াছে তাহা হইতেও ছাত্রনেতারা মুক্ত নহেন। কেননা তাহারা এই সমাজেরই অংশ। অতএব, এই সমস্যার গভীরে গিয়া চিন্তা করিতে হইবে এবং ইহা হইতে মুক্তির পথ অনুসন্ধান করিতে হইবে।
