‘নাইমা বিনতে নাহিদ’-এই কিশোরীর এখন আর তেমন কিছুরই দরকার নেই। তবে তার নামটি লিখতে আমাদের যা দরকার তা হলো কয়েকটি করুণ অক্ষর, খানিক দীর্ঘশ্বাস আর অনেকটুকু হাহাকার। যদি প্রশ্ন করেন কেন, তবে তার উত্তর এই যে; যে বয়সে তার পাওনা ছিলো সবচেয়ে কাছের মানুষদের নিরাপদ উত্তাপ, তখন সে একা, শীতল নিঃসঙ্গতার ঘেরাটোপে বন্দী। যে জীবনে পাওনা ছিলো রাশি রাশি হাসি, দৌড়-ঝাঁপ, সাঁতার, সাইকেল, বন্ধুদের খুনসুটি; সে জীবনে সে পেয়েছে তথাকথিত ভালো ছাত্রী হতে না পারার তিরস্কার। যে হাতে শত সহস্র সম্ভাবনার ঝলকানি দেয়ার কথা, সেই হাতে উঠে এসেছে ব্লেড, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরেছে কাগজে এবং সেখানে লেখা হয়েছে বাবা-মার যোগ্য সন্তান হয়ে উঠতে না পারার আক্ষেপ। যে কলম অভিজ্ঞতা নিতে পারতো জগতের আনন্দ যজ্ঞের, সেই কলম, সেই কিশোরী কলম লিখে ফেললো সুইসাইডাল নোট-যাতে লেখা ‘আমি মৃত্যু ছাড়া আর কোনকিছুই বুঝতে পারলাম না।’ একজন নাইমার মধ্যে আমরা খুঁজে নিতে পারি সমাজের অনেক নাইমাকে। এইচ.এস.সি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে দেখা গেল, অনুত্তীর্ণ কয়েকজন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করে বসলো। প্রশ্ন হলো, অনুত্তীর্ণতার সংজ্ঞা কী? সৃজনশীল পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে অনেক কথা শুনি। জানি না কী রকম সেই সৃজনশীল সিলেবাস যা একজন শিক্ষার্থীকে জীবনের পরীক্ষায় লড়াইমুখী করে তুলতে পারে না! নগরীর বিত্তবান শ্রেণির সন্তানদের জন্য নির্মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে যতটা প্রযুক্তিগত সুবিধার বিবরণ দেখি তার ছিটেফোঁটাও দেখি না মনন তৈরিতে তাদের ভূমিকা কী থাকবে, সে ব্যাপারে। বিজ্ঞান মনস্ক (!) তাবড় তাবড় মেধাবানদের বলতে শুনেছি সাহিত্য জীবনের কোন কাজে লাগে?
লেখক শাহাদুজ্জামানের প্রবন্ধে পড়েছি ভিয়েতনামের মেডিক্যাল কারিকুলামে এনাটমি ফিজিওলজির পাশাপাশি পড়ানো হয় মার্কস, হেগেল। তুরস্কের মেডিক্যাল কলেজে প্যাথলজি, ফার্মাকোলজির সঙ্গে পড়ানো হয় শেক্সপিয়ার, চেকভ। উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মানবিক বোধ জাগানো। শিক্ষা তথ্য দেয়, জানায়। সাহিত্য মানুষকে জাগায়। ভাববার বিষয়, নগরীর বিজ্ঞাপন মনস্ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সাহিত্য মনস্ক। নবম-দশম শ্রেণির একজন কিশোরীর উপযোগী সাহিত্য সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’-যদি তাকে পড়তে দেয়া হয় নারী জীবনের বিবিধ লড়াইয়ের সঙ্গে তো তার তখনই পরিচয় হয়ে যাবার কথা। জীবনকে চিনে নেয়ার কথা। নেই, নেই। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের মানবিকীকরণের সংযোগ নেই। সাহিত্যকে এখানে নেহাত্ই ম্লান, গুরুত্বহীন, অনাকর্ষণীয় বিষয় করে রাখা হয়েছে। চৌকস শিক্ষার্থী মানেই এখানে বিজ্ঞান আর বাণিজ্যের শিক্ষার্থী। অথচ সবার মন জটিল-কুটিল গণিতের সংখ্যার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় না। সন্ধ্যার বাতাসে সুদর্শনের উড়ে যাওয়া, শিমুলের ডালে লক্ষ্মী পেঁচার ডাক কিংবা রূপসার ঘোলা জলে কিশোরের সাদা ছেঁড়া পালের মধ্যে, ডিঙার মধ্যে, রাঙা মেঘ অথবা জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা সবুজ করুণ ডাঙায়ও তো কারো মন বসতে পারে। কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রমে এই কলমীর ঘ্রাণ ভালোবাসা শিক্ষার্থীদের ঠাঁই নেই।
এই বিমানবিক পাঠ্যক্রমের বিন্ধ্যাচল পেরিয়ে যেসব বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিত্সক, সৌজন্য বোধসম্পন্ন হিসেবে পরিচিত তাঁরা সিলেবাসের শিক্ষার কারণে নয় বরং ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানবিক। আমাদের মেডিক্যালের কার্ডিওলজি, হেমাটোলজি, ফিজিওলজি, কোনটির সিলেবাসে মানবিক হওয়ার উপাদান আছে? শাহাদুজ্জামানের লেখাতেই পড়েছিলাম, মেডিক্যালের বিখ্যাত সার্জারি টেক্সট বই ‘বেইলি এ্যান্ড লাভ’-শুরুই হয়েছে নাকি একটি কবিতা দিয়ে, যেখানে লেখকদ্বয় বলেছেন চিকিত্সা শাস্ত্র একইসঙ্গে সায়েন্স এবং আর্ট। আমাদের দেশের সায়েন্সের সিলেবাসে এমন আশা করাটা কষ্ট কল্পনা বলেই মনে হয়। পশ্চিমা পৃথিবীর অতি প্রতিযোগিতার জগতে চাপ উপশমের জন্য মিউজিক থেরাপীর ব্যবস্থা আছে। চিত্রকলা এবং সাহিত্যের সাহায্য নেয়ারও রেওয়াজ আছে। আবেগ সংক্রান্ত বিপর্যয়ে রঙ সুর এবং কবিতার প্রবাহ মানুষের মনকে যে নির্ভার করে, পশ্চিমের গবেষণায় তা বার বার প্রমাণিত হয়েছে। হিসাব বিজ্ঞান আর ব্যবসা প্রশাসনের কাঠখোট্টা আবহকে সংবেদনশীল মন কীভাবে আয়ত্ত করবে? বাংলাদেশ তো আর ব্রিটেন নয় যে, সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ক্লাসরুমে সাইকো-ড্রামা পারফরমেন্সের মাধ্যমে আবেগগত বিপর্যয় সামলানোর ব্যবস্থা করে রাখা আছে। কোন স্কুলের শিক্ষার্থীদেরই কি শিক্ষকেরা দারিদ্র্যের বাস্তবতা দেখানোর জন্য প্রত্যক্ষ শিক্ষা ভ্রমণের ব্যবস্থা করান? ফুটপাতের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখলে হয়তোবা বিত্তবান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আত্মহত্যাপ্রবণ শিক্ষার্থীদের মনে এই তত্ত্বের উদয় হতো যে, তারা নেহাত মন্দ নেই। মনে পড়ে নির্মলেন্দু গুণের ‘এক পঙ্গুর গল্প’ কবিতার কথা। জন্মসূত্রেই যে ছিলো ভাগ্যহত, বাবার পরিচয় ছিলো না। মা তাকে শোনাতো কোন এক কল্পিত বাবার কথা। ফিরে আশার আশ্বাস শুনিয়ে একদিন সেই মাও আবার বিয়ে করলেন। কোন এক দুর্ঘটনায় ট্রেনের নীচে কাটা পড়লো তার পা দুখানা। সহমর্মী কবি নিয়তির প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে যখন উষ্মা প্রকাশ করলেন এই বলে যে, সেও কেন মরলো না চিরদিনের মতো? পঙ্গু ভিখারীর উত্তর ছিলো, ‘জীবন তবু ভালো’। হাজার হাজার পৃষ্ঠা পড়েও যে অনুভূতির খোঁজ মেলে না-রেলস্টেশনের একজন পঙ্গু ভিখারী সেই জীবনের স্বাদ খুঁজে পান বাঁচার আনন্দেই। রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির দুনিয়া কাঁপানো সেইসব দিনে একজন কায়কোবাদ যখন বিপদের মুখে ফেলে শাহীনাকে বাঁচাতে এগিয়ে যান তখন সত্যিই জীবনের গভীর সত্যের স্বাদ পাই। অনুভব করি জীবন তবু ভালো। বেঁচে থাকলেই কেবল একজন কায়কোবাদের দেখা পাওয়া যায়। জানা যায়, জীবন কেবল দোয়েলের ফড়িংয়ের মতো তুচ্ছ নয়। এখানে কখনও কখনও মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়।
লেখক : কথা সাহিত্যিক
