ম্যালেরিয়ার নূতনরূপ ও ভবিষ্যত্ বিপদ

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২১:৩০
চট্টগ্রাম এবং তিন পার্বত্য জেলায় ম্যালেরিয়া মহামারীরূপে ছড়াইয়া পড়িতেছে। গত বুধবারে প্রকাশিত ইত্তেফাক রিপোর্ট হইতে জানা যায়, ম্যালেরিয়ার কারণে গত সাত মাসে ৫৭ জন মারা গিয়াছে, অন্যদিকে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। অথচ বিগত কয়েক বত্সর ম্যালেরিয়া রোগটি নিয়ন্ত্রণেই ছিল চট্টগ্রামের ম্যালেরিয়াপ্রবণ অঞ্চলে। কিন্তু চলতি বত্সরের এপ্রিল হইতে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ও তিন পার্বত্য এলাকাতে হঠাত্ করিয়া ম্যালেরিয়া ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। সংবাদভাষ্যে ‘হঠাত্’ শব্দটি ব্যবহার করা হইলেও বিষয়টি নিশ্চয়ই ‘হঠাত্’ নহে। সমপ্রতি বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাঁচটি জেলায় মহামারী আকারে ম্যালেরিয়া দেখা দিয়াছে। মশককুলের কোনো সীমান্ত নাই বিধায় তাহারা কোনো অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়িলে তাহা আশেপাশের অনুকূল পরিবেশেও ছড়াইয়া পড়ে। আর এই অনুকূল পরিবেশের অভাব নাই আমাদের সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে। তাহা ছাড়া, এই বত্সর বর্ষার বৃষ্টি হইতেছে একটুখানি বিরতির পর পরই। তাহাতে মশাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে মহাসমারোহে। ভ্যাপসা গরমে এতদঞ্চলের অধিবাসীরা মশারি টানাইতে উত্সাহিত হন না। পাহাড়ি এলাকার জুমচাষীরা এই সময় জঙ্গলে মশারি না টানাইয়াই নিদ্রাযাপন করেন। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস করিবার প্রকল্পে জুমচাষিদের মধ্যে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক জ্যাকেট বিতরণ করা হইলেও, কিংবা কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার বৃদ্ধি করিলেও তাহাদের কার্যকারিতা নির্ধারিত মেয়াদের পূর্বেই হ্রাস পাইয়াছে। সব মিলিয়া ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির পথ আর কে রুখিবে? মশককুলকে প্রতিহত করিতে বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানিরও রহিয়াছে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হইতেছে না। প্রকৃতপক্ষে মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ বহাল রাখিয়া ম্যালেরিয়াকে ঠেকাইয়া রাখা অসম্ভব। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করিতে ব্যর্থ হইয়া ঔষধ দ্বারা রোগ নিরাময়ের মাধ্যমে মৃত্যুর লাগাম কিছুটা টানিয়া ধরা সম্ভব হয় বটে, কিন্তু প্রধান নজর দিতে হইবে প্রতিরোধের দিকে। আর সেই প্রতিরোধের বিষয়ে জানা গিয়াছে নূতন আশঙ্কার কথা। তাহা হইল, মশার জিন পরিবর্তন। সত্তরের দশক পর্যন্ত এই উপমহাদেশ এবং অন্য দেশসমূহে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার ছিল ডিডিটি। সত্তরের দশকের পর নিয়মিত ডিডিটি ছড়াইবার পরও ম্যালেরিয়া ফিরিয়া আসিতে থাকে। শুধু এই উপমহাদেশই নহে, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ম্যালেরিয়া ফিরিয়া আসে প্রবলভাবে। তাহার কারণ অত্যন্ত উদ্বেগের। চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা জানাইলেন, জিন পরিবর্তন করিয়া অ্যানোফিলিস মশা দিব্যি তাহাদের মারণবাণ ডিডিটি’কে হজম করিয়া ফেলিতেছে! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইহার পর ডিডিটি-এর ব্যবহার বন্ধ করিয়া দেয়। কিমাশ্চর্যম, পরবর্তীকালে ডিডিটি-র পরিবর্তে কীটনাশক পাইরেথ্রয়েডও মশককুলকে দিব্যি হজম করিয়া ফেলিতে দেখা গেল! জিনগতভাবে পরিবর্তিত করিয়া ‘জিএম মশা’ বলিয়া এক ধরনের মশা ছাড়া হইল, যাহারা বন্ধ্যা। এবং তাহাদের সংস্পর্শে আসিয়া বন্ধ্যা হইবে মশকবংশও। কী বিচিত্র! ইহাও খুব বেশি সাফল্যের মুখ দেখিল না। ফলত, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়িয়াছে বিভিন্ন দেশে। ম্যালেরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে তাহার পুরনো মারণরূপ লইয়া। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে এইবার মশার অনুকূলে রহিয়াছে বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তন। গবেষকরা দেখিতে পাইয়াছেন, সমপ্রতি বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইবার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে উঁচুতে অবস্থিত এলাকাসমূহেও ম্যালেরিয়া ছড়াইয়া পড়িতেছে। তাপমাত্রার এহেন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকিলে ম্যালেরিয়ামুক্ত কিছু কিছু অঞ্চলেও ভবিষ্যতে লাখ লাখ বাড়তি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হইতে পারে। ম্যালেরিয়ার কারণে শুধু জীবনসংহারই ঘটে না, এই রোগে আক্রান্ত যে বিপুল পরিমাণ মানুষ অসুস্থ হইয়া কর্মহীন সময়ে বন্দী থাকে, যে বিপুল চিকিত্সাব্যয় হয়, সেই হিসাব বিবেচনায় আনিলে সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। সমপ্রতি ব্রিটিশ গবেষকরা ম্যালেরিয়ার ব্যয়বহুল টিকা আবিষ্কার করিয়াছেন বটে, কিন্তু তাহা সর্বসাধারণের জন্য নহে। ম্যালেরিয়া জীবাণু কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস নয় বিধায়, এবং পরজীবীদের জীবনচক্র অত্যন্ত জটিল বিধায় ইহার প্রতিষেধক এখনও দুর্লভ। তাই জীবাণু নহে, জীবাণুর বাহক মশাকে আটকাইতে যাহা যাহা করা প্রয়োজন, তাহার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দরকার এখন হইতেই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন